১৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ৩০শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

আগামী  জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে একমত পোষণ করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দল এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা দিলে যুক্তফ্রন্ট বর্তমান সংবিধান মেনেই সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে একমত পোষণ করেছে। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে যুক্তফ্রন্টের সাত দফার অধিকাংশই মেনে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তফসিল ঘোষণার পর সংসদ নিষ্ক্রিয়, সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত, মন্ত্রী-এমপিদের ক্ষমতা খর্ব, ইভিএম ব্যবহার, রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় রাজবন্দীদের মুক্তি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত ইত্যাদি দাবির বিষয়েও ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল। দ্বিতীয় দফা সংলাপেও সংবিধানের বাইরে সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের কিছু করণীয় নেই উল্লেখ করা হলে যুক্তফ্রন্টের নেতারা এই স্বল্প সময়ে সংবিধান সংশোধন করতে হয় এমন কোন দাবি জানাননি। এমনকি আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ অনুষ্ঠানে যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সকল সহযোগিতারও আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

বৈঠক শেষে বারিধারার নিজভবনে আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং করে যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান একিউএম বদরুদোজ্জা বলেন, সংলাপ আন্তরিকভাবে হয়েছে। আশাবাদের দিকে যাচ্ছে সবকিছু। সরকার নিরপেক্ষ থাকলে, নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে আমরা নির্বাচনে যেতে পারি। আমাদের সকল দাবি বাস্তবসম্মত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তা বিবেচনার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা দেখব দাবিগুলো কিভাবে বাস্তবায়িত হয়। রাজনৈতিক কারণে রাজবন্দীদের মুক্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নামের তালিকা দিতে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সরকারের নয়, রাষ্ট্রপতির অধীনে থাকার দাবিও প্রধানমন্ত্রী মেনে নিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিটি দাবি ও দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া মতামত তুলে ধরেন তিনি। এর আগে গণভবন থেকে বেরিয়ে তিনি বলেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের সব কথা শুনেছেন, আমরা আশাবাদী। সংলাপ নিয়ে সন্তুষ্টু প্রকাশ করেন তিনি। পরে বিকল্পধারার মহাসচিব আব্দুল মান্নান বলেছেন, আমরা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাব।

বি চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগাগোড়া সবার কথা শুনেছেন এবং যুক্তফ্রন্টের অনেকগুলো দাবির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন। তিনি বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, সরকারের ক্ষমতা সীমিত করা, নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত সবাই কমিশনের অধীনে কাজ করা, তফসিল ঘোষণার পর মন্ত্রী-এমপিরা এলাকায় কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না প্রভৃতি বিষয়ে একমত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ও সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার দাবি প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেননি বলে জানান বি চৌধুরী। তবে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রাখার পক্ষে মত দেন প্রধানমন্ত্রী। বিকল্পধারার সভাপতি বলেন, ইভিএম বন্ধের দাবি করেছি, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এটা নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলবেন।

বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমরা তাদের অধিকাংশ দাবির সঙ্গেই একমত পোষণ করেছি। তবে সংবিধান সংশোধন করতে হয় এমন কোনো দাবি জানায়নি যুক্তফ্রন্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুরোধ জানালে তাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট অংশগ্রহণ করবে।

বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচন সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বদরুদ্দোজা চৌধুরী এক পর্যায়ে বলেন, সরকারে কে আসুক সেটি বড় কথা নয়, আমরা চাই দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকুক। যে বিরোধী দল অতীতের মতো সংসদে নোংরা কথা বলবে না, কিন্তু সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে দেশকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী হাস্যরত করে বলেন, ‘আপনি বিরোধী দলে কেন, ইচ্ছা করলে সরকারেও থাকতে পারেন। জবাবে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, আমার বয়স হয়েছে। নির্বাচন হয়ত করব না। কিন্তু আমার দলের কিছু তরুণ অভিজ্ঞ নেতা রেখে যাব। তারা অনেক গঠনমূলক কাজ করতে পারবে’।

রাত প্রায় ১১টায় গণভবনে প্রেস ব্রিফিংকালে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, সাত দফার মধ্যে অনেক দাবি আমরা মেনে নিয়েছি। আমার কাছে মনে হয়েছে যুক্তফ্রন্ট নেতারা সংলাপে খুশি। প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যে আমাদের মাত্র তিনজন নেতা আমির হোসেন আমু, ওবায়দুল কাদের ও মইনউদ্দীন খান বাদল কথা বলেছেন। বাকি দীর্ঘসময়ই যুক্তফ্রন্টের নেতাদের কথা ধৈর্য সহকারে শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী। তারা লেভেলে প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই নির্বাচনের সময় সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে। তফসিল ঘোষণার পর সংসদ ভেঙ্গে দেয়া কিংবা নিষ্ক্রিয় রাখার অপর দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদের শেষ অধিবেশন শেষ হয়েছে, এটি এখন নিষ্ক্রিয়ই। আর অধিবেশন বসার সুযোগ নেই দেশে যুদ্ধ না বাধলে। আর তফসিল ঘোষণার পর মন্ত্রী-এমপিরা নির্বাচনী আচরণবিধি সম্পূর্ণভাবে মেনেও চলবে। মন্ত্রীরা নিজ এলাকায় গাড়িতে পতাকা উড়াতে পারবে না। এমপিরা কোনো সুযোগ-সুবিধা পাবে না, কোনো প্রকল্পও উদ্বোধন করতে পারবে না।

তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করার যুক্তফ্রন্টের দাবি প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, তফসিল ঘোষণার পর সবকিছু নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে যাবে। এখানে সরকারের কিছু নেই। যেহেতু ইসি রাষ্ট্রপতির অধীনে, তাই বিষয়টি তিনি (প্রধানমন্ত্রী) রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলবেন। সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষতার সঙ্গে শান্তি রক্ষা মিশনে কাজ করার জন্য শুধু দেশে নয়, সারাবিশ্বে আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী প্রশংসিত। দেশের যে কোনো সঙ্কটকালে, দুর্যোগে তারা অসামান্য অবদান রাখছে। তাই সেনাবাহিনী যত্রতত্র ব্যবহার করা উচিত হবে না। তবে নির্বাচনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে অবশ্যই সেনা মোতায়েন থাকবে। ইভিএম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি আধুনিক প্রযুক্তি। সীমিত পরিসরে এবার ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে ইসির চিন্তাভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়েও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলব। রাজনৈতিক কারণে রাজবন্দীদের মুক্তি দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তালিকা দেয়ার জন্য।

সন্ধ্যা সাতটা ৪০ মিনিটে গণভবনের ব্যাংকোয়েট হলে সংলাপ শুরু হয়। প্রথমেই বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরী ফুল দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। বৈঠকটি শেষ হয় প্রায় ১১টায়। বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের ২১ সদস্য এতে অংশ নেন। আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অংশ নেন ২৩ সদস্য। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যে ফ্রন্টের নেতারা গণভবনে প্রবেশ করেন। প্রথমে তাদের স্বাগত জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। দুই জোটের নেতারা একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।

শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী যুক্তফ্রন্ট নেতাদের উদ্দেশে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এরপর যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে বি চৌধুরী তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরেন। পরে একে একে উভয়পক্ষের নেতারা বক্তব্য রাখেন। গণভবনে প্রবেশের সময় যুক্তফ্রন্ট নেতারা সংলাপ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কথা সাংবাদিকদের জানান। এদিকে সংলাপের শুরুতে যুক্তফ্রন্ট নেতাদের নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। এরপর রাতের খাবারে অংশ নেন সবাই।

অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা ॥ সংলাপের শুরুতে সূচনা বক্তব্যে যুক্তফ্রন্ট নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে চাই। যাতে জনগণ তাদের নেতৃত্ব খুঁজে নিতে পারে। কিভাবে সেই নেতৃত্ব খুঁজে নিতে পারে সেটাই আমাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব না। এ ধারা অব্যাহত থাকুক এবং উন্নয়নের গতি সচল থাকুক।

যুক্তফ্রন্ট নেতাদের প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক ঘাত প্রতিঘাত ও বাধা অতিক্রম করে আমরা গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখছি। জনগণের কল্যাণে কাজ করছি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকুক এটাই আমরা চাই। গণতান্ত্রিক ধারা বজায় থাকলে দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে, আমরা সেই সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী প্রথমে গণভবনে আসার জন্য যুক্তফ্রন্টের নেতাদের স্বাগত ও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, গণভবন জনগণের ভবন। আপনারা এখানে এসেছেন এজন্য ধন্যবাদ জানাই।

ঐক্যফ্রন্টের সংলাপকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনের সামনে সন্ধ্যার আগে থেকেই বিপুল সংখ্যক উৎসক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। শামিল হয়েছিলেন ঐক্যফ্রন্টসহ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতাকর্মীরাও। দেশবাসীরও চোখ ছিল গণভবনের দিকে। কি হবে সংলাপে। এ নিয়ে ছিল টানটান উত্তেজনা। সংলাপের সফলতা কামনা করে গণফোরামের নেতাকর্মীদের সেখানে মোমবাতি হাতে মানববন্ধন করতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যা গণভবনের সামনের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন রকম। শুনশান নীরবতা। সংলাপকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মী কিংবা উৎসুক জনতার কোনো ভিড় ছিল না। তবে মিডিয়া কর্মীদের উপস্থিতি ছিল।

সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে যুক্তফ্রন্ট নেতা জেবেল আহমদ গনি, খন্দকার গোলাম মর্তুজা, মঞ্জুর রহমান এশাসহ একে একে সব নেতাই গণভবনে প্রবেশ করতে থাকেন। এর আগে বিকেলে বি চৌধুরীর গুলশানের বাসায় যুক্তফ্রন্ট নেতারা বৈঠক করেন। সংলাপে ফ্রন্ট নেতাদের অবস্থান নিয়ে কথা হয়। তাছাড়া কারা কারা সংলাপে কথা বলবেন তাও ঠিক করা হয় বৈঠকে। কোন কোন বিষয়ে ফ্রন্টের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দেয়া হবে, দাবি দাওয়ার বিষয়ে কতটুকু ছাড় দেয়া সম্ভব এসব বিষয় আলোচনায় ওঠে আসে। এরপর বি চৌধুরীর নেতৃত্বে ফ্রন্ট নেতারা গণভবনের উদ্দেশে রওনা দেন।

সংলাপে বিকল্পধারার পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিসমূহের মধ্যে রয়েছে –

১. নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড অর্থাৎ সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে, সম্ভব না হলে নিষ্ক্রিয় করতে হবে। এজন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

২. নির্বাচনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কর্মচারীদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন শতভাগ রাষ্ট্রপতির অধীনস্থ করতে হবে। তফসিল ঘোষণার পর এমপিরা সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোনো প্রকল্প উদ্বোধন বা প্রতিশ্রুতি যাতে না দিতে পারেন সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় আইন করে মন্ত্রী ও এমপিদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করতে হবে। সরকারি দলের প্রার্থীদের বিলবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার অপসারণ করতে হবে।

৩. নির্বাচনকালীন সরকার চাই। জাতীয় সরকার গঠন, প্রয়োজনে এক দিনের জন্য সংসদ ডেকে জাতীয় সরকার গঠন করা যেতে পারে। অথবা মন্ত্রিপরিষদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা জোট থেকে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েও একটি সন্তোষজনক নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। নির্বাচনে সকল প্রকার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার অথবা বর্তমান সরকারের নির্বাচন বিষয়ে সম্পূর্ণ ক্ষমতা সীমিত করতে হবে।

১৪ দলের সঙ্গে সংলাপ শেষে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য রাখছেন যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

৪. আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী আমাদের জন্য গর্বের। তারা বিভিন্ন দেশে নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধ ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ সুনামের সঙ্গে করে আসছে। সুতরাং নির্বাচনের আগে ও পরে যাতে শান্তি-শৃঙ্খলার বিঘ্ন না ঘটে- সেহেতু আমাদের প্রস্তাব,

ক. সেনাবাহিনীকে নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে এবং নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পর পর্যন্ত মোতায়েন করতে হবে।

খ. নির্বাচনের দিন সেনাবাহিনীকে সীমিত ক্ষমতা দিতে হবে যেমন- আটক রাখার ক্ষমতা ও তাদের ভোট কেন্দ্রে থাকতে দিতে হবে। যাতে করে ভোটের দিন আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি না হয় এবং ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন।

৫. ইভিএম : আধুনিক এবং বিজ্ঞানমনস্ক নির্বাচনে আমাদের অনেক আগ্রহ আছে, কিন্তু ইভিএম সম্পর্কিত যেসব প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন প্রয়োজন তা আমাদের নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যথেষ্ট নেই। সেজন্য এ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার সঠিক হবে না বলে আমরা মনে করি।

৬. নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কারণে আটক বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে।

৭. নির্বাচন সম্পর্কিত মামলা নির্বাচনের পর এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন অতি সত্তর প্রণয়ন করতে হবে।

সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৩ সদস্যের প্রতিনিধি দল সংলাপে যোগ দেন। এর মধ্যে ১৪ দলের শরিক নেতারাও রয়েছেন। সংলাপে অংশ নেয়া আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতাদের মধ্যে রয়েছেন দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংলাপে উপস্থিত ছিলেন।

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফরউল্যাহ এবং ড. আব্দুর রাজ্জাক, আবদুল মতিন খসরু, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডা. দীপুমনি, আব্দুর রহমান, প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, দফতর সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ এবং আইন সম্পাদক শ. ম. রেজাউল করিমও উপস্থিত ছিলেন। ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, জাসদ একাংশের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, জাসদ আরেক অংশের কার্যকরী সভাপতি মঈনউদ্দিন খান বাদল সংলাপে অংশ নেন।

গণভবনে যুক্তফ্রন্ট নেতাদের আপ্যায়ন করান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংলাপ শেষে নৈশভোজে লাল আটার রুটি খাওয়ার তালিকা আগেই পাঠিয়েছিলেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তার পছন্দ মতো রুটি বানানো হয়। এছাড়া নৈশভোজের মেন্যুতে বি চৌধুরীর পছন্দ মতো সাদা ভাত, ফুলকপি, শিম, আলুভাজি, যে কোনো মাছের ঝোল, মসুর ডাল রাখা হয়েছিল। এছাড়াও চা, কফি, জুসসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চলমান রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে সংলাপ করেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তার ১৪ প্রতিনিধি দল। ৩০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করে চিঠি লেখেন বি চৌধুরী। এই চিঠি পাওয়ার পর সংলাপের জন্য প্রধানমন্ত্রী ২ নভেম্বর দিন ঠিক করেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে প্রতিনিধি দলের তালিকা বিকল্পধারার সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার ওমর ফারুকের মাধ্যমে পাঠানো হয়।

বি চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব) আব্দুল মান্নান, প্রেসিডিয়াম সদস্য শমসের মবিন চৌধুরী, গোলাম সারোয়ার মিলন, আবদুর রউফ মান্নান, ইঞ্জিনিয়ার মুহম্মদ ইউসুফ, সহ-সভাপতি মাহমুদা চৌধুরী, মাহবুব আলী চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার ওমর ফারুক, সাবেক সংসদ সদস্য এইচ এম গোলাম রেজা, বিএলডিপি সভাপতি নাজিম উদ্দিন আল আজাদ, সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, ন্যাপের সভাপতি জেবেল রহমান গানি, মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, এনডিপির চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্তুজা, জাতীয় জনতা পার্টির সভাপতি শেখ আসাদুজ্জামান, বাংলাদেশ জন দলের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান জয়, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ইউনাইটেড মাইনরিটি ফ্রন্ট চেয়ারম্যান দীলিপ কুমার দাস, লেবার পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হামদুল্লাহ আল মেহেদী, মজহারুল হক শাহ্, মনজুর হোসেইন ঈসা-মহাসচিব এনডিপি। প্রথমে ১৪ জন সংলাপে অংশ নেয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২১ সদস্যের প্রতিনিধি দল অংশ নেন।

বৃহস্পতিবার প্রথম দিনের সংলাপে গণফোরামের ড. কামাল হোসেন ও বিএনপির নেতৃত্বে ২০ সদস্যের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। সংলাপ শেষে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলেছেন, চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের বিশেষ পথ তৈরি হয়নি। তাছাড়া একদিনের সংলাপে সব সমস্যা সমাধান হবে একথাও মনে করেন না ফ্রন্ট নেতারা। তবে সাত দফার মধ্যে তিনটি বিষয়ে কাছাকাছি অবস্থানে আসে উভয়পক্ষ। প্রধানমন্ত্রী ফ্রন্ট নেতাদের বলেছেন, সাংবিধানিক ও আদালতের ইস্যুতে তাদের করণীয় কিছু নেই।

দ্বিতীয় দিনের সংলাপে অংশ নেয় বিকল্পধারার নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের নেতারা। আগামী চার নভেম্বর ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে সংলাপ করবেন প্রধানমন্ত্রী। পাঁচ নবেম্বর এরশাদের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সংলাপ করার কথা রয়েছে। ৮ নভেম্বর পর্যন্ত সংলাপ চলবে। এর মধ্যে ছোট্ট পরিসরে ফের ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যে কোনো সময় সংলাপ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও ফ্রন্ট নেতারা।

এরপর গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপি-জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে যুক্তফ্রন্টের বাকি দুই শরিক জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য জোট থেকে বেরিয়ে যায়। এদিকে গত ১৬ অক্টোবর ২০ দলীয় জোট ছেড়েছেন বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি। এরপর গত ১ নভেম্বর যুক্তফ্রন্টে যুক্ত হয়েছে আরও ছয়টি দল। দলগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, জাতীয় জনতা পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ মাইনোরিটি ইউনাইটেড ফ্রন্ট। এছাড়া বিকল্পধারায় যোগ দিয়েছেন জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) নেতা মোঃ গোলাম রেজা, গণফ্রন্ট নেতা কামাল পাশা, মুসলিম লীগ নেতা নূর এ আলম, জনদল নেতা জয় চৌধুরী ও খলিল চৌধুরী।