১লা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ১৭ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যা কোনো আকস্মিক কিংবা ছোটখাটো দ্বন্দ্ব থেকে নয়, এটা দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ, এছাড়া রয়েছে রোহিঙ্গা রাজনীতির নানা সমীকরণ। যার পেছনে আছে দেশি-বিদেশী শক্তিশালী চক্র।

তারা বলছেন, এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের লোকজনকে খুঁজে বের করা না গেলে, সার্বিক সংকটে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পে পরিবার নিয়ে থাকতেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস-এর প্রধান মুহিবুল্লাহ। তার পাশেই সংগঠনটির প্রধান কার্যালয়। ২৯ সেপ্টেম্বর ৭ থেকে ৮ জন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত সেখানে ঢুকে মাত্র মিনিট খানেকের মধ্যেই তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়।

স্থানীয়রা বলছেন, মুহিবুল্লাহকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য সার্বক্ষণিক তার সাথে থাকতো ২০ থেকে ২৫ রোহিঙ্গা। এমন পাহারার মধ্যে দুর্বৃত্তরা কি করে তাকে হত্যার পর নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেলো।

ঘটনার জন্য আরসাকে দায়ী করছেন তার স্বজনরা। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, মুহিবুল্লাহ হত্যা অনেক সুপরিকল্পিত। যার পেছনে আছে রোহিঙ্গা রাজনীতি বিষয়ক নানা সমীকরণ। সম্পৃক্ত আছে অনেক শক্তিশালী চক্র।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, এখানে স্বার্থসংশ্লিষ্ট যারা আছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসন নিয়ে, একটা জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটানোকে দমন করানোর জন্য একটি অন্তর্ঘাতমূলক পরিকল্পনা থেকেই এ হত্যাকাণ্ড।

মানবাধিকার কর্মী নুর খান বলেন, রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ড নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটা ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে অনেক শক্তির সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা রয়েছে। যারা হত্যাকাণ্ডটি সংগঠিত করেছেন তারা একটি বড় পরিকল্পনার অংশ বাস্তবায়ন করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সবকিছুই সামনে রেখে এ ঘটনার তদন্ত হচ্ছে। এজন্য কাজ করছে একাধিক টিম।

১৪ এপিবিএন অধিনায়ক নাইম উল হক বলেন, যেহেতু মুহিবুল্লাহর লোকজনের সামনে এ ঘটনাটি ঘটেছে, এটা অন্ত কোন্দলও হতে পারে।তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করেই এ বিষয়ে বলতে পারবেন।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার মো.হাসানুজ্জামান জানান, মুহিবুল্লাহকে হত্যার  নেপথ্য কি কারণ রয়েছে তা খুঁজে বের করা হচ্ছে।

আর পড়ুন:   করোনাভাইরাস সংক্রমণের সর্বোচ্চ রেকর্ড ভারতে

তবে মুহিবুল্লাহ হত্যার কারণ এবং জড়িতদের পরিচয় স্পষ্ট করা না গেলে, ভবিষ্যতের জন্য এটা বড় অশনি সংকেত হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে মত পর্যবেক্ষকদের।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পররাষ্ট্র সচিব

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন

রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার পর ক্যাম্পগুলোতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধি দল।

শুক্রবার (৮ অক্টোবর) দুপুরে বিমানযোগে কক্সবাজারে পৌঁছান প্রতিনিধি দলটি। তারপর সরাসরি ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে নিহত রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লার পরিবারের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সঙ্গেও কথা বলবেন তারা।

এর আগে, কক্সবাজার বিমান বন্দরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সরাসরি এখানে আসা হয়েছে। এ ঘটনার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি টিম কাজ করছে বলেও জানান সচিব।

প্রতিনিধি দলে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন ছাড়াও বাকি তিনজন হলেন— পশ্চিম ইউরোপ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মহাপরিচালক ফায়াজ মুর্শিদ কাজি, পররাষ্ট্র সচিবের দফতরের মহাপরিচালক মো. আলীমুজ্জামান ও সহকারী সচিব শোয়াইব-উল ইসলাম তরফদার।

প্রতিনিধি দলের সফরের কথা জানিয়ে কক্সবাজার ১৪ আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক এসপি নাঈমুল হক বলেন, ‘প্রতিনিধি দল ক্যাম্প পরিদর্শনে আসছেন। তাই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

এদিকে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবি করা হয়েছে। অবশ্য রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যায় জড়িত সন্দেহে ৫ জনকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, পাশাপাশি ক্যাম্পের সার্বিক নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিজ সংগঠনের কার্যালয়ে অবস্থানকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ। এ ঘটনায় ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে উখিয়া থানায় ৩০২/৩৪ ধারায় একটি মামলা রুজু করা হয়। যার বাদী নিহত মুহিবুল্লাহর ছোট ভাই হাবিব উল্লাহ।

আর পড়ুন:   বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে নতুন এমপিদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা