৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বিশেষ প্রতিবেদক *

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা যখন বিরোধী দলের নেতা, ক্ষমতায় যখন বিএনপি-জামায়াতের মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক ও ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের জোট, তখন এ জোটের শীর্ষ নেতারা আওয়ামী লীগের সমাবেশে দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য এক নজিরবিহীন গ্রেনেড-বোমা হামলা করেছিল। নিরপক্ষে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, কীভাবে বিএনপির সহসভাপতি এবং খালেদা জিয়া তনয় তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, ১৯৭৫-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম হত্যাকারী কর্নেল নূর হরকত উল জিহাদের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে হাওয়া ভবনে বৈঠকের পর বৈঠক করে এ নৃশংস হামলার পরিকল্পনা করেছিল। হামলায় গুরুতর আহত হয়ে শেখ হাসিনা এবং দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকে দৈবক্রমে বেঁচে গেলেও কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। গুরুতর আহত তিন শতাধিক কর্মী অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন।

বিএনপি-জামায়াত জোট যখন ক্ষমতায় ছিল (২০০১-২০০৬) বাংলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠেছিল সোয়া শ’ জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন । অধিকাংশের নেপথ্য নেতারা ছিলেন জামায়াতে ইসলামী এবং এখনকার হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত। সেই সময় সারা দেশে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী থেকে আরম্ভ করে আদালতের বিচারক, এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য- কেউই জঙ্গী হামলা ও হত্যা থেকে রেহাই পায়নি। জঙ্গীরা পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজ বোঝাই করে গ্রেনেড ও অন্যান্য সমরাস্ত্র এনেছে বাংলাদেশে এবং প্রতিবেশী ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসী ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য।

সেই সময় জঙ্গী মৌলবাদীরা যাবতীয় গ্রেনেড-বোমা হামলার দায় স্বীকার করলেও খালেদা-নিজামীদের জোট সরকার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কলের গানের ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো বার বার একই কথা বলেছে- এসব হামলার জন্য দায়ী আওয়ামী লীগ ও ভারত। ২০০২ সালের ৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের তিনটি সিনেমা হলে একযোগে বোমা হামলা চালিয়েছিল ‘হরকত-উল জিহাদ’। এ বোমা হামলার কয়েক ঘণ্টার ভেতর সরকার  ইতিহাসের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবির, সাংবাদিক এনামুল হক, সেলিম সামাদ ও প্রিসিলা রাজসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ের কয়েক ডজন নেতাকে গ্রেফতার করেছিল। এই হামলার সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততা প্রমাণের জন্য সদ্য ভারত থেকে আসা এক শিক্ষার্থী পার্থ সাহাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং ‘জজ মিয়া নাটক’ও সাজানো হয়েছিল। গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে এ মর্মে লিখিত জবানবন্দী প্রদানের জন্য- সিনেমা হলে বোমা হামলার জন্য নাকি আওয়ামী লীগ ও ভারত দায়ী! একই ভাবে ২০০৪ সালেও সরকাররি মহল থেকে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগ দায়ী না হলে শেখ হাসিনা বাঁচলেন কিভাবে! তখন এমন জঘন্য কথাও বলা হয়েছে- শেখ হাসিনা তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন! ঘটনার তদন্ত করতে আগ্রহী স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে তদন্ত করতে না দিয়ে সমস্ত আলামত দ্রুত মুছে ফেলে সরকার একটি লোক দেখানো কমিশন করেছিল, যার প্রতিবেদনে এই হামলার জন্য ভারতকে দায়ী করা হয়েছে। অথচ থলের বিড়াল পরে ঠিকই বেরিয়েছে।

আর পড়ুন:   শব্দদূষণ শারীরিক ও মানসিক সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ-বিভাগীয় কমিশনার

জামায়াত জঙ্গী মৌলবাদীদের গডফাদার হলেও তারা সব সময় বিষয়টি অস্বীকার করেছে। উত্তরবঙ্গে জেএমবি নেতা সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাই যখন শরিয়া আদালত বসিয়ে হত্যা ও নির্যাতনের মোচ্ছবে মেতেছিল তখন জামায়াতের প্রধান এবং জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী বলেছিল- বাংলা ভাই নাকি মিডিয়াসৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্র। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্পের কাদম্বিনীর মতো র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে বিচারের পর ফাঁসিতে ঝুলে বাংলা ভাইকে প্রমাণ করতে হয়েছে সে কোনো ‘মিডিয়াসৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্র’ ছিল না।

ইসলামের দোহাই দিয়েই ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াত এবং তাদের সহযোগীরা স্মরণকালের ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করেছিল এ বাংলাদেশে।

১৯৭৫-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী শীর্ষ নেতাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ঘটেছে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড-বোমা হামলা ও হত্যাকাণ্ড। আওয়ামী লীগের অনেকে এখন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের কথা বলছেন। জামায়াত-হেফাজতের প্রতি নমনীয় আচরণ করছেন। কিন্তু পাকিস্তান ও জামায়াত সব সময় আওয়ামী লীগকে তাদের প্রধান শত্রু মনে করেছে এবং এখনও তাই করে। হাল আমলে যে সব জঙ্গী ধরা পড়েছে তাদের জবানবন্দী থেকে এবং তাদের আস্তানা থেকে জব্দ করা বিভিন্ন দলিলপত্র ও প্রকাশনা থেকে জানা গেছে, জামায়াত ও জঙ্গীদের হত্যাতালিকার প্রথম নামটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। কেন শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে হবে এ বিষয়ে মুফতি হান্নানও তার সাক্ষাতকারে বলেছে, জামায়াত-বিএনপি-হুজি ইত্যাদি মনে করে শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রেখে বাংলাদেশে তাদের ‘ইসলাম’ কায়েম করা যাবে না। বাংলাদেশে পাকিস্তানের একান্ত অনুগত দল বিএনপি জামায়াতের অস্ত্র, অর্থ, সার্বিক পরিকল্পনা ও সহযোগিতা ছাড়া ২১ আগস্টের মতো ভয়াবহ হামলা সংঘটিত করা কারও একক শক্তিতে সম্ভব ছিল না।

২১ আগস্টের হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে আর্জেস গ্রেনেড, যার দশ ট্রাকের একটি চালান ধরা পড়েছিল ২০০৪-এর এপ্রিলে। তখন এ নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। পরে তদন্তেও জানা গেছে- একজন নিরাপত্তা প্রহরীর অজ্ঞতার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের জঙ্গীদের জন্য পাকিস্তান থেকে আনা দশ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়লেও বিএনপি-জামায়াতের জোটের জমানায় সরকারি সহযোগিতায় জঙ্গীরা এ রকম বহু দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাই পথে আমদানি করেছে, যা ব্যবহৃত হয়েছে ২১ আগস্টে এবং এর পূর্বাপর যাবতীয় গ্রেনেড-বোমা হামলায়।

আর পড়ুন:   মাস্ক পরা নিশ্চিতে সরকারের নতুন পদক্ষেপ

জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর পুত্র হায়দার ফারুখ মওদুদী পাকিস্তানে একজন ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত, যিনি পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সঙ্গে জামায়াত, বিএনপির সম্পৃক্ততা রয়েছে।২০০৪ সালে গোপনে দশ ট্রাক অস্ত্র আমদানির ঘটনার সঙ্গে আইএসআই কিভাবে অনুঘটকের কাজ করেছে, তার বিষদ বিবরণ দিয়েছে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তারা। জামায়াত-বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল গোয়েন্দা বিভাগসহ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আইএসআই’র এদেশীয় এজেন্টদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এ কথা অস্বীকার করা যাবে না- ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মহাজোট সরকার মাঠপর্যায়ে জঙ্গী দমনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাফল্য প্রদর্শন করেছে। গত বারো বছরে লক্ষাধিক জামায়াত ও জঙ্গীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু বিচার বিভাগসহ প্রশাসনের সর্বত্র তাদের সহযোগীদের অবস্থানের কারণে শতকরা ৯৫ ভাগ জঙ্গী জামিনে বেরিয়ে এসে আত্মগোপন করেছে। তাদের গোপন ষড়যন্ত্র, হামলা ও হত্যার প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে বঙ্গবন্ধু  কন্যা শেখ হাসিনার ওপর উপর্যুপরি হামলা ও হত্যাপ্রচেষ্টা একই সূত্রে গাঁথা।