৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মহামারি করোনার তাণ্ডবের কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আজ বৃহস্পতিবার (১৯ আগস্ট) থেকে খুলছে পাহাড়সহ দেশের সব পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা এতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। আরও এক সপ্তাহ আগে থেকেই পর্যটনকেন্দ্র খোলার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছেন হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা। তবে মাস্ক পরিধান ছাড়া পর্যটনকেন্দ্রে প্রবেশ করা যাবে না এবং পর্যটকদের অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, সরকারি-বেসরকারি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে জড়িত মানুষদের মধ্যে ফিরতে শুরু করেছে চাঞ্চল্য। পর্যটকদের বরণে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে রাঙামাটির হোটেল-মোটেলগুলো। পর্যটকদের আগমন ঘিরে নিরাপদ ভ্রমণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন পর্যটন ব্যবসা সংশ্লিষ্টরাও।

যান্ত্রিক জীবনের একটু ক্লান্তি দূর করতে বিনোদনের খোঁজে মানুষ ছুটে আসছেন পাহাড় ও হ্রদঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক লীলাভূমি রাঙামাটিতে। কিন্তু টানা দীর্ঘদিন পর্যটকশূন্য থাকায় মারাত্মক মন্দা দেখা দেয় পর্যটন ব্যবসায়।

রাঙামাটি চেম্বারের হিসাবে, জেলায় পর্যটনের পাঁচটি খাতে দিনে গড়ে অন্তত সোয়া দুই কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের ধারণা, দেশের পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেয়ায় দীর্ঘদিনের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠতে পারবে।

রাঙামাটিতে ঝুলন্ত ব্রিজ, পলওয়েল পার্ক, শিশু পার্ক, হ্যাপি আইল্যান্ড, সুবলং ঝর্ণা, পেদা টিং টিং, ইকো ভিলেজ, বনবিহার, রাজবাড়ী, আরণ্যক, বড়গাঙসহ নানা বিনোদনকেন্দ্রে সারা বছরই পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকে।

কাপ্তাই লেকের বোট মালিক আলাউদ্দিন টুটুল জানান, দীর্ঘদিন পর্যটন ব্যবসা বন্ধ ছিল। আমাদের বোটের চালকরা এতদিন বেকার ছিল। তবে তাদের নিয়মিত বেতন দিতে হয়েছে। সরকার দেশের পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেয়ার কারণে আমরা এই বেকার সময়ে বোটের সৌন্দয্য বৃদ্ধিতে রং ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে যান্ত্রিক কাজ সেরে রেখেছি।

রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ম্যানেজার সৃজন বিকাশ বড়ুয়া জানান, সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স খোলার প্রস্তুতি নিয়েছি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পর্যটকদের সেবা দিতে সব ধরনের প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছি। দীর্ঘদিন পর কর্মচারীরা মনের খুশিতে কাজ করছে। আমরা আশাবাদী, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারব।

আর পড়ুন:   জুলাইয়ের শুরুতে বন্যার আশঙ্কা

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক স্বাস্থ্যবিধি মেনেই আজ ১৯ আগস্ট জেলার পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেয়া হচ্ছে। পর্যটকরা অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘুরতে যাবেন। এটা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পর্যটনকেন্দ্রের কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে প্রতিদিনই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। আর পর্যটকদের নির্বিঘ্নে রাঙামাটি ভ্রমণে নিরাপত্তা দিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে।

রাঙামাটিতে পর্যটকদের মূল আকর্ষণ ৩৩৫ ফুট দৈর্ঘের ঝুলন্ত সেতুকে ঘিরেই। তাই পর্যটকেরা প্রথমেই ছুটে যান পর্যটন কমপ্লেক্স এলাকায়। বছরে প্রায় দুই লাখ দেশি ও বিদেশি পর্যটক সেতুটি দেখতে আসেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় থাকে এখানে।

এ ছাড়া শহরের পুলিশের ‘পলওয়েল পার্ক’, ডিসির ‘রাঙামাটি পার্ক’ সেনাবাহিনীর ‘আরণ্যক’, সুভলং ঝর্ণা, সুখীনীলগঞ্জ ও রাজবন বিহার এলাকায় প্রতিনিয়ত ভিড় জমান বেড়াতে আসা পর্যটকরা।

এ ছাড়া বাঘাইছড়ি উপজেলার আকর্ষণীয় ‘সাজেক ভ্যালি’তে পর্যটকদের বেশি সমাগম হয়।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আজ থেকে খুলছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ সব পর্যটন স্পটও। ইতোমধ্যে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল-কটেজ ও গেস্ট হাউজ খোলা  হয়েছে। সৈকতসহ পর্যটন স্পট খুলে দেয়ায় কক্সবাজারের পর্যটনখাতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া বিনিয়োগকারীরা হতাশা ছাপিয়ে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখছেন।

তবে, সরকারের পক্ষ থেকে কঠোরভাবে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত না করে সমুদ্র সৈকতে নামা যাবে না। সবাইকে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।

সরকারের এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলি, কবিতা চত্বর, হিমছড়ি, উখিয়ার ইনানী ও পাটুয়ারটেক এ সাত পয়েন্টে থাকবে টুরিস্ট পুলিশের দল।

জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় জেলা প্রশাসনের বিশেষ তিনটি দল কাজ করবে।স্বাস্থ্যবিধি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

টুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের সুপার মো. জিল্লুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, আজ ১৯ আগস্ট থেকে পর্যটন স্পটসমূহ শর্তসাপেক্ষে উন্মুক্ত করে দিয়েছে সরকার। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবায় আমরা নিয়োজিত আছি এবং থাকব। নিরাপদ দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে সৈকতে নামতে হবে সবাইকে। দলবদ্ধভাবে এক জায়গায় দাঁড়ানো যাবে না, জটলা সৃষ্টি করা যাবে না। সৈকতে আগত পর্যটকদের মাঝে সচেতনতামূলক প্রচারণা ও চালাবে টুরিস্ট পুলিশ। এজন্য প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। চলছে টিমওয়ার্ক।

আর পড়ুন:   ভাসানচর গেলেন আরও ১০১১ রোহিঙ্গা 

সরকারি নির্দেশনা মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে সৈকতসহ বিনোদন কেন্দ্রে যেতে পর্যটকদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন টুরিস্ট পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তা।

কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম সিকদার বলেন, ‘কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। এ সেবা খাতে নিয়োজিত অনেক প্রশিক্ষিত জনবল জীবন বাঁচাতে অন্য পেশায় চলে গেছেন। এ খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে সুদবিহীন ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করা জরুরি। এখন পর্যটন মৌসুম নয়। এখন খুব সীমিত পর্যটক হয়তো কক্সবাজার আসবেন। তারপরও সরকারি সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানায়।’

কক্সবাজার রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি নইমুল হক চৌধুরী টুটু্ল বলেন, ‘কক্সবাজার পর্যটন এলাকার প্রায় চারশ রেস্তোরাঁ মালিকের মধ্যে অন্তত দুইশ পুঁজি হারিয়ে এখন দায়-দেনায় জর্জরিত। তারা নতুন করে পুঁজি বিনিয়োগ করে পুনরায় ব্যবসা শুরু করার মতো অবস্থায় নেই। তাদের প্রণোদনা দেয়া উচিত।’

উল্লেখ্য, গত বছরের মার্চ থেকে চলতি বছরের মধ্য আগস্ট পর্যন্ত ১৬ মাসের প্রায় অর্ধেক সময় করোনার কারণে কক্সবাজার সৈকতসহ সকল পর্যটন স্পটগুলো বন্ধ ছিল।  কক্সবাজার শহর ও শহরতলির প্রায় চারশ খাবার রেস্তোরাঁ এবং পাঁচশ’র মতো আবাসিক হোটেল, গেস্টহাউস, কটেজ ও মোটেলও ছিল বন্ধ।