খন রঞ্জন রায় *

‘আমার গতরে ঘামের গন্ধ, চরণে ধূলার দাস/ আমারও আছে প্রেম ভরা বুক, মন ভরা অনুরাগ’। আবেগি এ চরণ দু’টির আড়ালে কবি কিন্তু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ করেছেন। আধিপত্যাবাদী পুরুষ যে ঘরে ঘরে, বাহিরে-ভেতরে, আদর্শে মতাদর্শে, নিপীড়ন নির্যাতনে পিষ্ট হন তার রূপও পূর্ণাঙ্গভাবে ফুঁটে ওঠেছে। পুরুষবাদীরা কিন্তু নীরব দর্শক হিসেবে বসে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করে তাঁদের জন্য আলাদাভাবে কিছু ভাববার শক্তি, সাহস, আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেছিল এবং তা আজকাল নয়, শতাব্দী প্রাচীন। পুরুষ দিবস ভাবনার উন্মেষ ঘটে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে। নানাভাবে, নানাভ্রমে, নানা নামে নারী দিবসের প্রতিকল্প একটি দিবস দাঁড় করানোর নিরন্তর নিরলস নিঃসংকোচ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। তারিখ নির্ধারণ ও তদ্বিষয়ে জনমত সৃষ্টি, যাচাই ও সামর্থ্যের প্রদর্শনী চলছিল। ১৯৬০ এসে উৎসাহিত কিছু ব্যক্তির যত্মশীল আগ্রহে বিশ্ব পুরুষ দিবস পালন শুরু করার নির্দশন পাওয়া যায়।

১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে প্রস্তাবনাকে সমর্থন করে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে প্রথম উদযাপনের বুদ্ধিমত্তা দেখায় এ দিবস ঘিরে। এরপরই ক্যারিবীয় দেশসমূহ উত্তর আমেরিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ গভীরভাবে আন্তরিকতার হৃদ্যতা সৌহার্দাতা নিয়ে পালন শুরু করে এ দিবস। ধনাত্মক ও মননশীল দৃষ্টিভঙ্গী নিযে জড়িয়ে পড়ে ইউনোস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংগঠন। পারস্পরিক স্নেহময় নৈকট্য নিয়ে লক্ষ্য আদর্শ ও উদ্দেশ্য গড়ে তোলার অনুকূল পরিবেশে নিবেদিত হয় পুরুষ অধিকার আন্দোলন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস, বিশ্ব শিশু দিবস, বাবা দিবস ইত্যাদির অনুরূপ, অনুকূল সর্ম্পকিত বিশেষ বিবেচনায় এনে নীতিমালার কাঠামো তৈরি করা হয়। সকল বৈষম্য দূরীভূত করে পুরুষ বালকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য যত্মশীল হওয়া, পরিবার ও সমাজে নারী পুরুষের দৈহিক সর্ম্পক উন্নয়নে সবাইকে উৎসাহিত করা, প্রচারণা চালানো, লৈঙ্গিক সাম্যতার বিষয়টি মানবতাবাদী, দরদি আদর্শে প্রচার প্রচারণা চালানো, সর্বক্ষেত্রে, সবসময় ইতিবাচক আদর্শে চরিত্রবান নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব আরোপ পুরুষ ও বালকদের নিয়ে অহেতুক, হেতুহীন, মুখরোচক প্রপাগান্ডা, প্রতিরোগ, সংস্কার, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে শক্ত, শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা। পুরুষ ও বালকদের অর্জন অবদানকে বিভিন্নভাবে, ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে উৎসাহ প্রদান ও আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করা। বৈবাহিক সর্ম্পকের ব্যাপারে সর্তক দৃষ্টি নিয়ে উন্নত, সৃজনশীল, যত্মশীল দরদি কার্যক্রম গ্রহণ করা। পুরুষের আবেগীয় শারীরিক মনকে আধ্যাত্মিক সেবামনষ্কতায় পরিবর্তনের প্রচেষ্টা অব্যহত রাখা। স্ত্রী নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হেনস্থার অজুহাত যেন কেবলমাত্র একতরফা পুরুষদের কাঁধে চাপানো না হয় সেদিক থেকে সুরক্ষা সম্ভাবনা জাগানোর দুরান্ত চেষ্টা করা। কর্মস্থলে পুরষকে মানসিক, অর্থনৈতিক, শারীরিক যৌন নির্যাতনের মত অপমানের শিকার যেন না হয় সেদিকেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখার নির্ভরযোগ্য চিন্তা থেকেই পুরুষ দিবসের উদ্ভব।

আর পড়ুন:   শিক্ষার উন্নয়ন করতে হলে  শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ সুযোগ বাড়াতে হবে

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শিক্ষা-সংস্কৃতি-রাজনীতি সমাজ সভ্যতায় পুরুষদের অধিকৃত ভূমিকা মানবজাতির এক অনন্য আলোচিত অধ্যায়। মানবসভ্যতার ইতিহাস জুড়ে পুরুষের ভূমিকা আর কর্তৃত্ব ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিভিত্তিক সমাজ পরিবর্তিত হওয়ার পর থেকে পুরুষের পেশীশক্তির ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমতে শুরু করে। ঐতিহ্যগতভাবেই পুরুষের লিঙ্গ ভূমিকা কঠোর পরিশ্রমী। পরিবারের ভরণপোষণ মেটানো পুরুষতান্ত্রিকতার বিকাশে অধিক সংবেদী ভূমিকা রেখে আসছে। নারী-পুরুষ সমান অধিকার মর্যাদা সুযোগ দেয়ার দীর্ঘ সংগ্রামেও আন্দোলনে কিছুটা বৈষম্য কমেছে বটে, তবে একচেটিয়া পুরুষভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে এখনো দর্পের দাম্ভিকতার। বিশেষ করে ধর্মগুরুদের বেলায়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের ক্ষেত্রে। রাজবংশের উত্তরাধিকার সূত্রে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ্য পুরুষ সন্তান রাজা হওয়ার ইতিহাস বিধান এখনো বলবৎ। পিতৃত্বের প্রভাববলয়ী রাজনীতি মার্কিন মুলুকের সংরক্ষিত টাইটেল পর্যায়ে পৌছে গেছে। কোনো নারী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি এই পর্যন্ত। সদ্য নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালাকে নিয়ে আগামীতেও কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি আর মানুষের চিন্তা চেতনা ধ্যানজ্ঞান পুরুষতান্ত্রিকতাকে উসকে দেয়ার মোক্ষম উদাহরণতো এর বেশি ঢের প্রয়োজন নেই।

পুরুষালীর এই উৎসাহ উন্নয়নে সামাজিকীকরণ ও জিনতাত্ত্বিকতার বির্তক ভূমিকা জোরালোভাবে প্রভাব ফেলে। লিঙ্গ পরিচয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক পরিচয় তুলে ধরার বেলায় ধর্মীয় অনুশাসনে, সাহিত্য সংস্কৃতিতে পুংলিঙ্গকে অবধারিতভাবে প্রাধান্য দেয়ার রীতি এখনো গর্বের, গৌরবের। আধিপত্যবাদী পুরুষালী শব্দের প্রতি স্বার্থপরতা, আন্তরিকতা, আর আলাদা সম্মান জানানোর দায়িত্বশীল অধিকারী ভূমিকা অনেক লিঙ্গ বিশারদগণও বিশেষভাবে আক্রান্ত। শারীরিক ও নৈতিক শক্তির সমন্বয়কে উহ্য রেখে পুংলিঙ্গ বৈশিষ্ট্য উন্নতকরণে নিজেকে সমর্পন করেন, সম্পৃক্ত থাকেন। তাঁদের যুক্তি পুরুষ শব্দটি একটু ওজনী, বয়স্ক, প্রাপ্তবয়স্কদের বেলায় প্রযোজ্য এবং সংরক্ষিত। যদিও নারী পুরুষের জন্মকালীন শরীরবৃত্তীয় ব্যতিক্রমী পার্থক্যের কিছু সুর্নিদ্রিষ্ট বৈশিষ্ট্যের বড় রকমের প্রভেদ আছে। সৃষ্টির রহস্য এখানেই। নারী পুরুষ উদ্দীপনা আর আলাদা গুণাবলীর আচার আচরণ অভিব্যক্তি অর্জনের দ্বিরূপতার রক্ষণীয় দিক ‘হরমোন’ আরো গভীরে গেলে ‘ক্রোমোসোম’। পুরুষের গৌণ মৌন বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রণকর্তা। কেবল মানুষ নয় অধিকাংশ স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে জেনেটিক এই জিনগত গঠন বৈশিষ্ট্য প্রযোজ্য। পুরুষ প্রজনন ও এই সংশ্লিষ্ট অঙ্গ বিষয়ক এন্ড্রোলজি বিশেষজ্ঞরা পুরুষের বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিগত জীবন প্রণালীর সামাজিক ও আইনগত নানাদিক নিয়েও সোচ্চার গবেষণা ও নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

আর পড়ুন:   ২০১৮ সালে ৭ হাজার প্রাণ  ঝরেছে সড়কে

সামাজিক ক্ষেত্রে কোনো কোনো সমাজে বিশেষ করে বাঙালি সংস্কৃতিতে  ‘শৈশবে মা, যৌবনে বউ/অন্তে মেয়ের শাসনে/ বন্দি পুরুষ, মরবে যদি / এদের কথা না শোনে’। এর থেকে উত্তরনের উপায় খুঁজে। নারীর তুলনায় একটু বেশি অসুখ বিসুখ আক্রান্তের পুরুষেরা সংসারকেই নির্ভরতার প্রতীক মনে করে। শ্রম-পরিশ্রম, বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, জিনতত্ত্বকে বির্বতনের হিসাবে রেখে বস্তুসংস্থানে অধিক মনোযোগী হয়। এরপরও পুরুষরা হয় অধিকারহারা, জর্জরিত হয় আইনের অপজালে। অপমানিত হয় ৮৩ শতাংশে পুরুষ তাঁর নিজ ঘরে। পরিবার দ্বারা। এইসব বিষয়সমূহ জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য, প্রকৃত অবস্থা উন্মোচনের বাসনায় পালন করা হয় আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস। বাংলাদেশে এই দিবস পালন খুব বেশি আগ্রহী, জনপ্রিয় না হলেও ইদানীং কিছু সংগঠন দারুণ সব কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হয়, জোড়ালো ভূমিকা রাখে এই দিবসে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আসুন আমরাও বালক পুরুষদের লৈঙ্গিক ভারসাম্যতার প্রচারে, তাঁদের অধিকারে সোচ্চার হই। লিঙ্গ, জাতিগত বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে অনুকরণীয় আদর্শের জাতিতে পরিণত হওয়ার কাজে হাতে হাত মিলাই।

লেখক-টেকসই উন্নয়নকর্মী

 

 

khanaranjanroy@gmail.com