৮ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২২শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

খন রঞ্জন রায় *

“যে জন দিবসে মনের হরষে, জ্বালায় মোমের বাতি, আশুগৃহে তাঁর দেখিবে না আর, নিশীথে প্রদীপ ভাতি’ মানবজীবনের অতি অপরিহার্য বিষয় মিতব্যয়িতা নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের চরণ দুইটিতেই যথার্থ ভাব ফুটে ওঠেছে। অর্থব্যয়ের যে তিন ধারা কাপর্ণ্য, মিতব্যয় আর অপব্যয় এর মধ্য থেকে মধ্যপন্থাকে উৎসাহিত করতেই গান, কবিতা, ছন্দ, গালমন্দ, আদেশ, উপদেশ, ধর্মীয় আদর্শ, মনুষত্ব, সামাজিকরীতি অপচয়ের ভীতিকে উৎসাহিত করা হয়। ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংযম প্রদর্শনের আহবান জানানো হয়েছে। আয় বুঝে ব্যয়কে অনেকটা সমর্থন করানোর, মধ্যপন্থা অবলম্বনের স্বীকৃত ধারায় চলাচলের জোরালো পরামর্শ দেয়া হয়।

কেবল প্রস্তুতকৃত খাদ্য অপচয় নষ্টের হিসেবে প্রতিবছর সারা বিশ্বে ১৩০ কোটি টন ব্যবহারের অতিরিক্ত রান্না করতে হয়। উচ্ছৃষ্ট থাকে। খাবারের প্লেটের বাড়তি হিসেবে ময়লা আবর্জনার স্তুপে নিক্ষিপ্ত হয়। পরিবেশ ক্ষতি ছাড়া টাকার অংকে তা ৬০ লাখ কোটি টাকা। অথচ বলা হয়ে থাকে প্রতিদিন ২০ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাতে ঘুমাতে যায়। পরিসংখ্যান বলছে ধনী দেশসমূহে যাদের আমরা উন্নত রাষ্ট্রের নামাবলী জড়িয়ে দেই সেইসব রাষ্ট্রের অল্প কয় লোকজনের পরিমিত, সীমিত চালচলনের ফলে যে পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে  তাতেই পুরো পৃথিবীর দরিদ্র লোকদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো যাবে। তা কিন্তু একদিনের জন্য নয়। বরাবর তিন বছর। জাতি হিসেবেও অর্থপূর্ণ একই কথা, যে জাতি যত মিতব্যয়ি সে জাতি তত উন্নত। আর্থ-সামাজিক দিক হতে ততবেশি সুসংহত। ব্যক্তির বেলায় তো আরো বেশি প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয়, যথার্থ, কল্যাণকর। মিতব্যয় যে একটি বড় ধরনের আয়, তার হিসাব কষতে আগপিছ ভাবনায় জড়াতে হয় না। নিজের ওপর ভাবনার ডালপালা মেললেই সহজে প্রমাণ হয়ে যায়। একটাকা কম খরচ করার অর্থ এ টাকাটার অধিক আয় আর ব্যয়ের সমন্নয় করাই মিতব্যয়।

অপব্যয় দারিদ্রতা ডেকে আনে। নিজকে অসহায়ত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ করে। অমিতব্যয়িতা জীবনে কখনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। এহেন চরিত্রের অধিকারীরা ব্যক্তিজীবনে ভবিষ্যতে কপর্দকহীন হয়ে দিনাতিপাত করে। পথের ভিখারী হয়ে অন্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরে, হাত পেতে জীবন সংসার চালাতে হয়েছে, এমন উদাহরণ আমাদের চারপাশে একটা নয়, ভুরিভুরি। জীবনের চাহিদা ও সঞ্চয়ের পরিমাণের মধ্যে সংগতি না থাকলে, সমন্বয় না হলে পরিণাম অবধারিত অর্থসংকট। সংসারের দাবী তো থাকবেই শেষ বলে কোনো কিছু নেই। প্রয়োজনীয়তা আর যৌক্তিকতা বিবেচনায় আনার কৌশলই হলো মিতব্যয়। কঠোর শ্রমের মাধ্যমে, বিনিময়ে অর্জিত সম্পদ হেলাফেলায় ব্যয় করাই অমিতব্যয়। ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, জাতীয় জীবন একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত, সংযুক্ত, একত্রিত। একে অপরের পরিপূরক। শুরুটা ব্যক্তি দিয়ে ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর বাকী সব নির্ভরশীল। জীবনে সুখ ভোগ করতে হলে, আশপাশের মানুষের সুখ শান্তি, কল্যাণে সহযোগী হতে হলে, সম্পদের যথাযোগ্য ব্যবহার, পরিমিত, সীমিত ব্যয় একান্ত অপরিহার্য।

মিতব্যায়িতা মানবজীবনের একটি অতি মহৎ গুণ। পৃথিবীর প্রতিটি ধর্ম বিশ্বাসেও এই ব্যাপারে বারেবারে, নানাভাবে, আকারে ইংগিতে, কখনো বা সুনির্দ্রষ্টি করে ব্যয় সংকোচনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অপচয়কারীকে শয়তানের সাথে তুলনা করে বাকীদের সম্পদ ব্যয়ে সুষম হতে, পরিমিত, প্রয়োজনভিত্তিক হতে সুষ্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। বলা হয়েছে সম্পদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সম্পদ অর্থ। সেই অর্থ যদি অপব্যবহার হয়, অপরিমিত হয়, অতিরিক্ত হয় তা বিপদজনক হয়, ব্যয়কারী মানুষ অমানুষের কাতারে সামিল হয়। ‘অর্থ অনর্থের মূল’ ভাবধারা পরিপূর্ণতা লাভ করে। সদ্বব্যবহার মানবতার আদর্শীক ভিত্তি বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।

পৃথিবীতে সম্পদহীন, বিত্তহীন লোকের সংখ্যা বেশি। বিত্তহীনদের চিত্তকে প্রফুল্ল করতে, বিকাশ ঘটাতে সম্পদশালীদের প্রতি সহানুভূতি জাগাতে মিতব্যয়িতার স্বপ্ন আমাদের দেখতেই হবে। কেবল দৈব দুর্বিপাক আর ধর্মীয় অনুশাসনের বাধ্যবাধকতার হিসেবে ঘুরপাক না খেয়ে কল্যাণকর মিতব্যয় জাতির স্বপ্নে বিভার হওয়াই উত্তম পথ। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগাতে পারলেই অগ্রসর জাতির তকমা সকল মানুষের লালাটে ঝুলবে। অর্থের প্রাচুর্য আর সম্পদের বাহাদুরি থেকে বেড়িয়ে আসার পথ উন্মুক্ত হবে। অন্যায়, অবৈধ পথে প্রাণপণে সম্পদ সংগ্রহের অপতৎপরতা রোধ হবে। সম্পদ আর প্রাচুর্য্য জীবনের সকল সুখ স্বাচ্ছন্দ্য নয়, তা উপলব্ধির জন্য যথেষ্ট দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে। যদিও অর্থ উপার্জনের প্রবণতা ধনী, গরীব, কাঙ্গাল, ভিখারী সকলের মাঝেই দুরন্ত দুর্বার গতির। এখানে তৃপ্তির বিষয়টি মুখ্য, প্রধান হিসেবে বিবেচনায় আনা হয়। দীন-দরিদ্র, আড়াল-চাড়াল, ভুখা-নাঙ্গারাও অর্থ উপার্জন করে। উপার্জনই যে যথার্থ পরিচয় নয়, মূল পরিচয় ব্যয়ের ধারার মধ্যে, ধারাবাহিকতার ভেতরে প্রবাহমান, ব্যয়ের ক্ষেত্রসমূহকে নানাভাবে বিবিধকারণে, বিবেচনায় আনা। বাড়াবাড়ি কিংবা সীমালঙ্গন কোনটাই অনুমোদিত হিসেবের মধ্যে আমলে আনা হয় না। ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যম পন্থার জীবন দর্শন হচ্ছে সর্বজন গ্রহণীয়। এখানে পরিস্কার করে বলা প্রয়োজন যে মিতব্যয়িতা চর্চার অর্থ কৃপণতা নয়। জীবনধারনের সর্বক্ষেত্রে কার্পণ্যতাকে ঘৃণা করা হয়। ঘৃণিত কাজ। অতিরিক্ত বিলাসিতা পরিহার করে প্রয়োজনীয় ব্যয়নীতি অবলম্বন করাই মিতব্যয়িতা। জীবন সফলতার অন্যতম মাধ্যম। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে মসৃণ পথচলা, পরিকল্পিত বাজেট নির্ধারণ করে চাহিদা ও সামর্থ্যকে সমন্নয় করা, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান দ্রব্যাদির অন্যতম ‘অর্থ’কে ভোগান্তিহীন, নিরাপত্তাপূর্ণ করার ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত নগদ অর্থ বিলিবণ্টন ব্যবস্থার মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করা, তৈরি করে রাখা, মানবিক কল্যাণে ব্যয়ের মানসিক শক্তি অর্জন করা, নিজের এবং পারিবারিক সুস্থতা নিশ্চিতকরণে প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাতে কোনোরকম অবহেলা কৃপণতা না করাও প্রকৃতপক্ষে পরোক্ষভাবে ব্যয়সংকোচনের বুদ্ধিমান পন্থা। সর্বোপরি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পরিবেশের ওপর ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয় এমন কাজ থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকা, অকারণে অবহেলায় সময় নষ্ট না করে নিরলসভাবে অবসর সময় কাটানোও মিতব্যয়িতার অতুলনীয় অংশ। অর্থনীতি, দর্শন, বিলাসী মানসিকতায় আচ্ছন্ন না হওয়া, মানসম্পন্ন টেকসই অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী জিনিসের সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ ব্যবহারে নিশ্চিত, ইত্যাদি চিন্তা করে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ইতালির মিলানে সঞ্চয়ী মনোভাবাপন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিনিধিদের কংগ্রেস বসেছিল। ওখানেই সিদ্ধান্ত হয় মিতব্যয়িতা দিবস পালনের। সমৃদ্ধি ও সম্পদের জন্য সঞ্চয় অপরিহার্য্য ভাবনা মাথায় রেখে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৩১ অক্টোবর প্রতিবছর সৃজনশীলতার সাথে পালন হয়ে আসছে এই দিবস। জীবন-জীবিকা নির্বাহ নানা সুপারিশ, পরামর্শ, আইন-কানুন, নীতি আদর্শ, আদেশ নির্দেশ প্রতিপালন আকঙ্ক্ষার মধ্যে আমরা যেন হিতকর ইতিবাচক হই, অযথা অহেতুক বেমক্কা পরিস্থিতির শিকার না হই আজকের দিবসে এ কল্পনা।

লেখক-টেকসই উন্নয়নকর্মী

khanaranjanroy@gmail.com