খন রঞ্জন রায় *

জাতিসংঘ পঁচাত্তর বছরে পা দিয়েছে। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর একটি মানবিক ও আন্তর্জাতিক সংঘ হিসেবে জাতিসংঘের আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রতিবছরের মতো এবারও জাকজমকের সাথে এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবার নিয়ে ৭৪ বার দিবসটি পালিত হলো। বর্তমান বিশ্বের স্বাধীন জাতিসমূহের সর্ববৃহৎ সংগঠনের নাম জাতিসংঘ। ১৯২০ সালের ১০ জানুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তি এবং নিরাপত্তা’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৫৮টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে ‘লীগ অব নেশন্স’ বা ‘সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জাতিসংঘের ধারণা প্রথম সূচনা করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৫ সালের ১ জানুয়ারি সম্পাদিত ‘সম্মিলিত জাতিসমূহের ঘোষণার’ মাধ্যমে জাতিসংঘ শব্দটির প্রথম ব্যবহার হয়।

১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ২৬ জুন সানফ্রানসিস্কোতে আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রশ্নে ‘জাতিসমূহের সম্মেলনে’ ৫০টি দেশের রোটারি আন্তর্জাতিকের প্রতিনিধিগণ জাতিসংঘ সনদ রচনা করেন। ১৯৪৪ সালের আগস্ট-অক্টোবরে ওয়াশিংটনের ডাম্বার্টন ওকসের বৈঠকে চীন, ফ্রান্স সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে এ সনদ গড়ে ওঠে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ৫০টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি ১৯৪৫ সালের ২৬ জুন সনদটি অনুমোদন ও স্বাক্ষর করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইর্য়ক শহরে ১৯৫২ সালে সদর দপ্তর নির্মাণের পর থেকে এটি জাতিসংঘের দাপ্তরিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটন বারোর টার্টাল বে এলাকায় ১৬ একর জমিতে ১৯৪৯ থেকে ১৯৫০ সালে নির্মাণ করা হয় ভবনটি। সদর দফতর স্থাপনের জমি কেনার জন্য জন ডি রকফেলার জুনিয়র ৮.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে সদর দফতরের উদ্বোধন হয় ১৯৫১ সালের ৯ জানুয়ারি।

জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব অ্যান্তোনিও ম্যানুয়েল দে অলিভেরা গুতেরেস। ১৯৯৫ থেকে ২০০২ সাল মেয়াদে তিনি পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তিনি জাতিসংঘে মহাসচিবের পদে আছেন। এর আগে ২০০৫ সালের জুন থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশানর ছিলেন। এছাড়া সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০১৬ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ তাকে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে ঘোষণা করে। জাতিসংঘের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন মহাসচিব। জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদ মোতাবেক মহাসচিবকে ‘প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যান্তেনিও ম্যানুয়েল দে অলিভেরা গুতেরেসের আগে আরও আটজন জাতিসংঘে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন- ট্রাইগভে লাই, নরওয়ে, ডেগ হামারশোল্ড, সুইডেন, উ থান্ট, মিয়ানমার, কুর্ট ওয়াল্ডহেইম, অস্ট্রিয়া; জ্যাভিয়ার পেরেজ দ্য কুয়েলার, পেরু, বুট্রোস বুট্রোস ঘালি, মিসর, কফি আন্নান, ঘানা ও বান কি মুন, দক্ষিণ কোরিয়া।

আর পড়ুন:   সাকিব আল হাসান চট্টগ্রামে সংবর্ধিত

বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পর্কের সূচনা হয় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল সরকার গঠনের পর বিশ্বের জনমত ও রাষ্ট্রসমূহের সমর্থন ও স্বীকৃতি আদায়ের উদ্দেশ্যে মুজিবনগর সরকারের একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল ১৯৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৬তম অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে দীর্ঘ বক্তব্য জমা দেন। সে সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, ইউনিসেফ প্রভৃতি জাতিসংঘ সংস্থা শরণার্থীদের জন্য কাজ শুরু করে। জাতিসংঘের এ সম্পৃক্ততার ফলে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম কৌশলগতভাবেও লাভবান হয়। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ১৩৬তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে যোগদান করে। যোগদানের এক সপ্তাহ পর ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় ভাষণ দেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জাতিসংঘ যুক্ত ছিল মূলত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ এবং শরণার্থীদের সহায়তাদানের লক্ষ্যে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যা উত্থাপিত হয়েছিল জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) আলোচ্যসূচিতে। ১৯৭৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মহাসচিব কুট ওয়াল্ডহেইম বাংলাদেশ সফরে এলে জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশের সর্ম্পকের উন্নতি হয়।

জাতিসংঘের সদস্যপদপ্রাপ্তির পর থেকেই বাংলাদেশ বিশ্বসভায় তার ভূমিকা রেখে চলেছে। জাতিসংঘের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হয়েছে বাংলাদেশ। জাতীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্র যেমন- উন্নয়ন, পরিবেশ, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শান্তিরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকে। জাতিসংঘে সদস্যপদ লাভের এক বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়। ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দুবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) এর সদস্য হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থনীতি, বিদ্যুৎ শক্তি, পরিবেশ, জরুরি সহায়তা, শিক্ষা, দুর্যোগ, খাদ্য, জেন্ডার ইস্যু, সুশাসন, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, অভিগমন, পুষ্টি, অংশীদারিত্ব, জনসংখ্যা, দারিদ্র, শরণার্থী, শহরায়ন, কর্মসংস্থান এবং জীবনধারণ। ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাতিসংঘ প্রত্যক্ষভাবে সহযোগীতা দিয়ে আসছে।

বর্তমান পৃথিবী নানাবিধ কারণে টালমাটাল। জাতিবিদ্বেষ ধর্মান্ধ সহিংস রাজনীতির কারণে মানুষই মানুষের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক কারণেই বসবাসের এই একমাত্র গ্রহটি ক্রমশ বসবাস অযোগ্য হয়ে উঠতে শুরু করেছে। বিশ্বখ্যাত জ্যোতি পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলছেন মানুষের হাতে কয়েকশ বছরের বেশি সময় নেই। উল্কাপিন্ডের আছড়ে পড়া, মেরু অঞ্চলের বরফ গলন, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদ কমে আসাসহ নানা বিপর্যয় পৃথিবীকে হুমকি দিচ্ছে। বিশ্ব টালমাটাল হওয়া করোনা পরিস্থিতিও একই কারণে। বৈজ্ঞানিক মতবাদের ভবিষ্যদ্বানীর প্রতিফলন। জাতিসংঘ সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, বর্তমান হারে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে ২০৩০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা হবে ৮৬০ কোটি, ২০৫০ সালে ৯৮০ কোটি এবং ২১০০ সালে তা বেড়ে হবে ১ হাজার ১০২ কোটি। যা বর্তমানে ৭৬০ কোটি। পারমাণবিক অস্ত্র অপেক্ষাও জনসংখ্যা বর্তমান বিশ্বের প্রধান সমস্যা। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা গোটা পৃথিবীর জন্য হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

আর পড়ুন:   কয়লাবোঝাই জাহাজ ডুবলো বঙ্গোপসাগরে  

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য জাতিসংঘের সরাসরি হস্তক্ষেপের মধ্যেও বর্তমান বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ শরণার্থী সংকটে ভুগছে। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে রাজনৈতিক, সামরিক, জাতিগত ও মতাদর্শের নানা সংকট মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে জাতি পরিচয়, বেঁচে থাকার অধিকার। ইতিমধ্যে ৬ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছে। শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটাচ্ছে ২ কোটি ২৫ লাখ মানুষ। এখনো ১ কোটি মানুষের কোনো পরিচয় নেই। কোনো দেশই এদের নাগরিক অধিকার স্বীকৃতি দিচ্ছে না। জাতি পরিচয়হারা এই মানুষরা পায় না শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার। প্রতি মিনিটে অন্তত ২০ জন মানুষ ঘরবাড়ি, দেশ সব ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে অন্য কোথাও। বেছে নিচ্ছে অনিশ্চিত ও করুণ শরণার্থীর জীবন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। ২৫ আগস্ট থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, জাতিসংঘের হিসাবমতে, এই সময়ের ব্যবধানে অন্তত ৪ লাখ ২১ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রবশে করা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১১ লাখ বলে ধারণা করা হয়।

শরণার্থী ছাড়াও বিশ্বে এখন হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৭৭ কোটি। যাদের দৈনিক আয় এক দশমিক ৯০ ডলারের কম। নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশসমূহের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২০৩০ সালকে টার্গেট করে এই কাজে অগ্রগামী হচ্ছে। ২০৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠায় শতবর্ষ পালন হবে। আগামী ২৫ বছরে জাতিসংঘ তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবে তা এই মুহুর্তে দুরাশা। সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া কোনো কালে কোনো অর্জনই সম্ভব হয়নি। আজকের দিনে একযোগে কাজ করার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। আমরা অবশ্যই আশাবাদী, জাতিসংঘ দিবস পালনের মাধ্যমেই বিশ্বশান্তির সূর্য উদিত হবে। অনাবিল শান্তির শুভ্রতায় উদ্ভাসিত হবে আমাদের এই গ্রহ, সুন্দর ভবিষ্যৎ রচনায় নিয়ামকশক্তি হবে জাতিসংঘ সেই প্রত্যাশা রইল।

লেখক-টেকসই উন্নয়নকর্মী

khanaranjanroy@gmail.com