বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত  মোবাইল অ্যাপভিত্তিক রাইড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পাঠাওয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহকে নিউইয়র্কে দাফন করা হয়েছে।

স্থানীয় সময় গতকাল রবিবার দুপুরে জানাজা শেষে নিউইয়র্ক শহরের উপকণ্ঠে অরেঞ্জ কাউন্টির প্রাচীন কবরস্থান পোকেসপি রূরাল সেমেট্রিতে তাকে দাফন করা হয়।  ওয়াপিংগার ফলসের আল নূর মসজিদের ইমাম ওসমানী জানাজায় ইামামতি করেন ।

জানাজায় অংশ নেয়া একজন বলেন, কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ফাহিম সালেহর জানাজা এবং দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় সেখানে পুলিশের উপস্থিতি ছিল। ফাহিমদের পরিবার বিশাল। পরিবারের সদস্য এবং কিছু আমন্ত্রিত প্রতিবেশি যোগ দিয়েছিলেন । সব মিলিয়ে ৮০-৯০ জন যোগ দেন ফাহিমের শেষ বিদায়ে।  ফাহিমের বড় বোন তার স্বামীকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ছুটে আসেন ভাইয়ের জানাজায় অংশ নিতে।

আগে থেকেই জানাজায় সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি নিষেধ করা হয়েছিল। তবে পারিবারিক বন্ধু হিসেবে একটি টেলিভিশনের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক নারী সাংবাদিক সেখানে উপস্থিত ছিলেন ।

                                                                                         ফাহিম সালেহর পারিবারিক এ ছবিটি এখন শুধু স্মৃতি

 

আকাশ ছোঁয়া সম্ভাবনার অপমৃত্যু

শুধু একগুচ্ছ স্বপ্নই নয়, একটি সম্ভাবনারও অপমৃত্যু ঘটিয়েছে খুনীর দল। তারা টুকরো টুকরো করে কেটেছে একটি শরীর। আর একই সাথে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে মা-বাবার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। বোনের আশা, ভরসা। আকাশ ছোঁয়ার ইচ্ছে ছিল ফাহিমের। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই স্বপ্নকে মুঠোয় ভরতে শুরুও করেছিলেন। কিন্তু তার সব স্বপ্ন, সব আশা ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছে খুনীর দল। সম্ভাবনার বরপুত্র বাংলাদেশী এই তরুণকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জের ধরে নাইজেরিয়ার পেশাদার খুনীর দল তাকে খুন করেছে। আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের অন্যতম অভিজাত এলাকা ম্যানহাটনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘরে ঢুকে নির্মমভাবে খুন করা হয় জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং অ্যাপস পাঠাও’র সহ প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহকে।

ফাহিমের জন্ম ১৯৮৬ সালে। সন্দ্বীপের হরিশপুর গ্রামের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সালাহউদ্দিন আহমেদ বিশ্বখ্যাত আইবিএম কর্পোরেশনের এডভাইজার হিসেবে আমেরিকায় চাকরি করতেন। আইবিএম থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন নিউইয়র্ক থেকে দেড়শ’ কিলোমিটার উত্তরের ডাচেস কাউন্টির ফুকেটসি এলাকায়। স্ত্রী রায়হানা, দুই কন্যা এ্যাঞ্জেলা ও রুবি এবং একমাত্র পুত্র ফাহিম সালেহকে নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদের চমৎকার সুখী সংসার। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। সালাহউদ্দিন আহমেদ সন্দ্বীপের মানুষ আর স্ত্রী রায়হানা নোয়াখালীর। ফাহিমের জন্ম এবং বেড়ে উঠা যুক্তরাষ্ট্রেই। স্কুল এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের লেখাপড়া অত্যন্ত সফলতার সাথে শেষ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্র্রের বেন্টলি ইউনিভার্সিটিতে ইনফরমেশন সিস্টেমে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পারিবারিক সূত্রগুলো জানায়, ফাহিম ২০০৯ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর থেকে চাকরি খুঁজছিলেন। নিউইয়র্কের পাশাপাশি তিনি বোস্টনের বিভিন্ন কোম্পানিতেও চাকরির আবেদন করেন। ওই সময় তিনি চাকরিও পেয়ে যান। কিন্তু জন্ম থেকে নিউইয়র্কের সাথে অন্যরকমের এক মায়ায় জড়িয়ে যাওয়া ফাহিম বিশ্বের নিউইয়র্ক শহর ছাড়তে চাননি। তাই বোস্টনের খ্যাতনামা একটি কোম্পানির অ্যাপয়নমেন্ট লেটার হাতে পাওয়ার পর যোগদান করার জন্য দুই সপ্তাহ সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। ওই দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি তৈরি করেন প্রাঙ্ক ডায়াল ডট কম নামের একটি ওয়েবসাইট। যে ওয়েবসাইটটি খুবই অল্প দিনের মধ্যেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে। দুনিয়ার নানা দেশের হাজারো মানুষ প্রাঙ্ক কল কেনার জন্য শত শত ডলার খরচ করতে থাকেন। এই সময় বেশ কিছু ওয়েব এডও তৈরি করেছিলেন তিনি। ইনফরমেশন টেকনোলজিতে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়া ফাহিম সালেহর সঙ্গে নাইজেরিয়ার এক তরুণও লেখাপড়া করতেন। দুজনে মিলে ২০টি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। কিশোরদের জন্য তৈরি করা এসব ওয়েব থেকে বছরে অন্তত তিন লাখ ডলার আয় হতো তাদের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানির। প্রাঙ্ক ডায়ালের মতো ওয়েব ডেভলপ করে এই কোম্পানির আয় রাতারাতি বেড়ে যায়। দুহাতে প্রচুর ডলার আসতে থাকে ফাহিমের। তিনি চাকরিতে যোগ না দিয়ে পুরোপুরি ওয়েব ডেভলপার হিসেবে কাজ করতে থাকেন। কোম্পানির সমৃদ্ধিতে আত্ননিয়োগ করেন ফাহিম।

ফাহিমের চাচাত ভাই, চ্যানেল আইর সিনিয়র প্রডিউসার মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, ফাহিম ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র এবং সজ্জন। ২০১৪ সালে দেশে এসেছিলেন ফাহিম। ওই সময়ে যুক্ত হন রাইড শেয়ারিং কোম্পানি পাঠাওয়ের সঙ্গে। পাঠাওর বিকাশে নানাভাবে কাজ করেন। প্রথমদিকে পাঠাও দিয়ে ডিজিটাল ডেলিভারির কথা থাকলেও পরবর্তীতে পাঠাওকে রাইড শেয়ারিং কোম্পানি হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় করে তোলেন।

টেক দুনিয়ায় সাড়া জাগানো ফাহিম সালেহর মাথা ভর্তি ছিল নিত্যনতুন উদ্ভাবনী আইডিয়া। এজন্য তাকে বিশেষ কদরও করতেন এই দুনিয়ার রতি মহারথিরা। কাড়ি কাড়ি ডলার আসতো তার একাউন্টে। প্রচুর অর্থ খরচ করতেন নিজের জন্য। পরিবারের জন্য। পিতা মাতার অসম্ভব ভক্ত ছিল ফাহিম। পিতা সালাহউদ্দীন আহমেদের গত জন্মদিনে সাড়া জাগানো একটি টেসলা গাড়ি উপহার দেন তিনি। বিদ্যুৎ চালিত এই গাড়ি এখন দুনিয়ার গাড়ি প্রেমিদের নিকট অন্যতম আকর্ষণীয় কার হিসেবেও বিবেচিত।

আর পড়ুন:   অপরাধী যে দলেরই হোক কাউকে ছাড় দেয়া হবে না  : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, বাংলাদেশ ছাড়াও, নেপাল, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া ও আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় আরও দুটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি। নাইজেরিয়ায় চালু করা ওকাডা ওই দেশের বর্তমান সময়কালের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং এ্যাপ। অত্যন্ত মেধাবী ফাহিম সালেহর স্বপ্ন ছিল রাইড শেয়ারিং অ্যাপসকে ভিন্নমাত্রার উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। তার আশা ছিল ইন্দোনেশিয়ার ওজেকের মতো পাঠাও’ও একদিন দারুণ এক সুপার অ্যাপে পরিণত হবে। শুধু রাইড শেয়ারিংই নয়, পেমেন্ট এবং ই-কর্মাসও করা যাবে এই অ্যাপসের মাধ্যমে। এজন্য নানাভাবে কাজ করছিলেন তিনি। অ্যাপসের মানোন্নয়নে রাত-দিন পরিশ্রম করছিলেন। নিউইয়র্ক শহরকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন ফাহিম সালেহ। পিতা মাতা নিউইয়র্ক থেকে দেড়শ’ মাইল দূরে থাকেন। অথচ ফাহিমকে প্রতিদিনই ছুটতে হয় নিউইয়র্কে। তাই ছোটাছুটি না করে মন দিয়ে কাজ করে অ্যাপসের উন্নতি ঘটানোর জন্য তিনি বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় বিশ কোটি টাকা (২২ লাখ ডলার) দিয়ে কিনেন একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। নিউইয়র্কের অন্যতম অভিজাত এলাকা ম্যানহাটনে নিজের রোজগারের টাকা দিয়েই ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন তিনি। ওই ফ্ল্যাটে একা বসবাস করে অ্যাপস নিয়ে নানাভাবে গবেষণা করতেন তিনি। ঘাতকের দল সেই ফ্ল্যাটেই সম্ভাবনার এই বরপুত্রকে নির্মমভাবে খুন করে।

ফাহিম সালেহর পারিবারিক সূত্র জানায়, ভাইকে না দেখে ফাহিম সালেহর বোন ৯১১ এ ফোন করেন। ফোন পেয়ে নিউইয়র্ক পুলিশ ম্যানহাটনের ওই ফ্ল্যাটে যায়। গত ১৪ জুলাই মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ ওই ফ্ল্যাটে ঢুকে ড্রয়িং রুমের মেঝেতে একটি মস্তকবিহীন দেহ পড়ে থাকেত দেখেন। এমনকি হাত এবং পা গুলোও শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা ছিল। মৃতদেহের পাশেই পড়েছিল একটি ইলেক্ট্রিক করাত। এছাড়া কয়েকটি প্লাস্টিকের ব্যাগেও ফাহিমের শরীরের খণ্ডবিখণ্ড কয়েকটি অংশ পাওয়া যায়। তার শরীরের সবগুলো অংশই পাওয়া গেছে। খুনীরা নির্মমভাবে তাকে খুন করে ইলেক্ট্রিক করাত দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করেছে। সবগুলো টুকরোই ড্রয়িংরুমে ফেলে রেখে খুনী ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেছে। কী কারণে ফাহিম সালেহকে এমন নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে ।  ফাহিম সালেহর বাবা সালাহউদ্দিন আহমেদকে উদ্বৃতি দিয়ে পারিবারিক একটি সূত্র জানায়, ফাহিম গত কিছুদিন ধরে পিতার কাছে তার নাইজেরিয়ান পার্টনারের ব্যাপারে নানা কথা বলতেন। নাইজেরিয়ানেরা অত্যন্ত রাফ এবং তাদের সাথে ব্যবসা করা কঠিন বলেও তিনি পিতার কাছে আক্ষেপ করছিলেন। ফাহিমের খুনীদের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার রহস্য উদঘাটনে নিউইয়র্ক পুলিশ কাজ করছে বলেও পারিবারিক সূত্রটি জানিয়েছে।

ফাহিম সালেহকে উন্নয়নশীল বিশ্বের ইলন মাস্ক বলা হতো বলে জানিয়েছেন নিউইয়র্কের প্রবাসী সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম বাচ্চু। একসময়কার চট্টগ্রামের এই সাংবাদিক বলেন, ফাহিম সালেহ আইটি জগতে বাংলাদেশের ইমেজকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাকে উন্নয়নশীল দেশের ইলন রিভ মাস্ক হিসেবে বিবেচনা এবং সম্মান করা হতো। খুনীরা একটি অপার সম্ভাবনার দুয়ার বন্ধ করে দিল বলেও সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম বাচ্চু মন্তব্য করেন।

প্রসঙ্গতঃ ইঞ্জিনিয়ার ইলন রিভ মাস্ক দক্ষিণ আফ্রিকার একজন খ্যাতনামা প্রকৌশলী। ১৯৭১ সালে দক্ষিন আফ্রিকায় জন্মগ্রহনকারী এই প্রকৌশলী বিশ্বের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি খাতের কৃতি উদ্যোক্তা। তিনি মহাকাশ ভ্রমণ সংস্থা স্পেসএঙের সিইও এবং সিটিও, বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান টেসলা মোটরসের সিইও ও পণ্য প্রকৌশলী, সোলার সিটির চেয়ারম্যান ও পেপ্যালের একজন সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার। ফাহিম সালেহর ভেতরে একদিন ইলন মাঙকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো সম্ভাবনা ছিল বলেও সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশের অত্যন্ত মেধাবী এবং সম্ভাবনাময় যুবক ফাহিম সালেহর নির্মম হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। শোকের ছায়া বিরাজ করছে সন্দ্বীপে। তথ্য প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ছিল ফাহিমের। মাত্র ১৬ বছর বয়স থেকে আইটি দুনিয়ায় শুরু হয়েছিল তার দাপুটে পদচারণা। ঘাতকের দল সব সম্ভাবনার দুয়ার চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে।

ফাহিম সালেহর অভিযুক্ত খুনী হ্যাসপিল (সাদা পোশাকে)

 

ফাহিম সালেহ হত্যায় অভিযুক্ত হ্যাসপিল ধরা পড়ে যেভাবে

বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পাঠাও এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহ’র হত্যার অভিযোগে তার ব্যক্তিগত সহকারী হ্যাসপিলকে গ্রেফতার করেছে নিউইয়র্ক পুলিশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২১ বছর বয়সী হ্যাসপিল কর্তৃক ১ লাখ ডলার আত্মসাতের ঘটনা ফাহিম ফয়সাল জানার পর বিষয়টি পুলিশের কাছে না জানিয়ে শুধু ওই পরিমাণ ডলার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য চাপ দেয়। এ ঘটনার জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক পুলিশ।

আর পড়ুন:   ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩৫ জন করোনা রোগী শনাক্ত

নিউ ইয়র্ক পোস্ট জানায়, বাড়ি ভাড়া নেয়ার অ্যাপ এয়ারবিএনবি’র মাধ্যমে গত ১৫জুলাই নিউ ইয়র্কের ক্রসবি স্ট্রিটের একটি বাসায় ওঠেন হ্যাসপিল। ওই লেনদেনও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছিলেন তিনি, যার সূত্র ধরে তদন্তকারীরা হ্যাসপিলের খোঁজ পান।

ফাহিম সালেহর ওপর ব্যবহৃত টেজারটিও হ্যাসপিল নিজের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে কেনেন বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং নিউ ইয়র্ক পোস্টের খবর অনুযায়ী, ফাহিমকে খুন করার পর গাড়ি ভাড়া করে ম্যানহাটনের একটি দোকানে যান হ্যাসপিল, যেখান থেকে তিনি অ্যাপার্টমেন্ট পরিষ্কার করার জিনিসপত্র কেনেন। এই সময় হ্যাসপিল ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে গাড়ি ভাড়া দেন।

হ্যাসপিলের গ্রেফতারের পর থেকে তার ব্রুকলিনের অ্যাপার্টমেন্ট এবং তাকে যেখান থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে সেই অ্যাপার্টমেন্টে পুলিশ তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে খবর প্রকাশ করেছে এনবিসি নিউইয়র্ক।

মঙ্গলবার ফাহিম সালেহ’র লাশ পাওয়া যাওয়ার পর পুলিশকে উদ্ধৃত করে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তা ক্যামেরায় দেখা যায় যে কালো স্যুট এবং কালো মাস্ক পরা একজন ব্যক্তির সঙ্গে একই লিফটে প্রবেশ করেন ফাহিম সালেহ। লিফট ফাহিম সালেহ’র অ্যাপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়ালে দুজনেই সেখান থেকে বের হয়ে যান।

শুক্রবার হ্যাসপিল গ্রেফতার হওয়ার পর নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান রডনি হ্যারিসন সাংবাদিকদের বলেন, “অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর (ফাহিম সালেহ) আর্থিক ও ব্যক্তিগত বিষয়গুলোর তত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে অভিযুক্তের কাছে ভুক্তিভোগী বড় অঙ্কের অর্থ পেতেন।”

টাইরেস হ্যাসপিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তিনি ফাহিম সালেহকে বৈদ্যুতিক টেজার গান – যার সাহায্যে মানুষকে সাময়িকভাবে নিশ্চল করা যায় – দিয়ে আঘাত করার পর নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেন।

মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে ৩৩ বছর বয়সী ফাহিম সালেহ’র খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ পাওয়া যায়। ঐ অ্যাপার্টমেন্টটি ফাহিম সালেহ’র মালিকানাধীন ছিল।

নিউ ইয়র্কের পুলিশ টাইরেস হ্যাসপিলকে গ্রেফতার করার পর ফাহিম সালেহ হত্যা সম্পর্কে খুঁটিনাটি কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়।

পুলিশ প্রথমে ধারণা প্রকাশ করেছিল যে, পেশাদার খুনিরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা বলছে, তদন্তকারীদের কয়েকজনের সন্দেহ, অভিযুক্ত হ্যাসপিল গোয়েন্দাদের দিকভ্রান্ত করতে এরকম একটি ধারণা দিতে চাইছিলেন যে এই হত্যাকাণ্ডটি পেশাদার খুনিদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে।

মঙ্গলবার ফাহিম সালেহ’র বোন ম্যানহাটনের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে প্রথম মরদেহ দেখতে পান।এরপর প্রাথমিক তদন্ত শেষে ধারণা করা হয় যে তাকে ১৩জুলাই সোমবারই হত্যা করা হয়।

 

      ফাহিম সালেহ হত্যার প্রতিবাদে যুক্তলাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে স্থানীয় লিটল বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের আয়োজনে প্রতিবাদ -বিক্ষোভ             সমাবেশ

লস অ্যাঞ্জেলসে বাংলাদেশিদের মানববন্ধনঃ

ফাহিম সালেহ হত্যার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে মানববন্ধন করেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। স্থানীয় সময় গত শনিবার বিকেলে লস অ্যাঞ্জেলসের সোনার বাংলা চত্বরে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। লিটল বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের উদ্যোগে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।

ফাহিম সালেহ হত্যার প্রতিবাদে যুক্তলাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে স্থানীয় লিটল বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের আয়োজনে এক প্রতিবাদ বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গত শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেল ৫টায় এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। খুনির বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শহরের সোনার বাংলা চত্বরে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে অংশ নিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এসময় তারা হাতে কালো পতাকা, ব্যানার ও পোস্টার নিয়ে ফাহিম হত্যার আসল রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানান।

সমাবেশে উপস্থিত এক বক্তা বলেন, আমরা ফাহিমের এই হত্যাকাণ্ডে অত্যন্ত মর্মাহত। আমরা ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।

অন্য আরেক বক্তা বলেন, দ্রুত এর বিচার হোক সেটাই চাই। সেকেন্ড ডিগ্রি না, ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার বিবেচনা করে এই বিচার করা হোক।

বক্তারা আরও বলেন, ফাহিম ছিলেন দেশের এক রত্ন ও ক্ষণজন্মা।

প্রযুক্তির আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ফাহিম। স্বপ্নবাজ এই তরুণের স্বপ্ন ছিলো আকাশ ছোঁয়া। খুনিরা তার এই স্বপ্নগুলোকে ডানা মেলতে দেইনি আকাশে। ফাহিম ফিরবে না আর কখনো। তবে প্রতীক্ষা এইটুকু কবে দ্রুত এই হত্যার বিচার কার্যকর হয়।