৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ *

সময় যে কতো দ্রুত বয়ে যায়, বদরুলভাইয়ের দশম মৃত্যুবার্ষিকীর খবর পেয়ে তা টের পেলাম।দশবছর আগেই অর্থাৎ ২০০৯ সালের ৩আগস্ট হার্টস্ট্রোক করে অকালে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে তিনি পরকালে পাড়ি জমান।মৎস্য অধিধদপ্তরের উপ-সহকারি পরিচালক ছিলেন তিনি।সরকারি চাকরির কারণে সরাসরি রাজনীতির সুযোগ না থাকায় নেপথ্যে তিনি সীতাকুণ্ডের আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সীতাকুণ্ডের ছাত্ররাজনীতিতে রয়েছে তাঁর প্রবাদতুল্য অবদান।বদরুলভাই ছিলেন মুজিবাদর্শের পরীক্ষিত সৈনিক। সীতাকুণ্ডের গোলাবাড়িয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আ জ ম বদরুল হাসান খোকনের জন্ম।১৯৭৭ সালে তিনি সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। মেধাবী ছাত্র খোকন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিসহ এলএলবি, বি.এড ও বিদেশি নানান ডিগ্রি অর্জন করেন।কলেজজীবনে এসে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ছাত্ররাজনীতিতে তিনি ছিলের ভ্যানগার্ড সংগঠক।সীতাকুণ্ড তথা চট্টগ্রামের স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনে বদরুল হাসান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।আশির দশকে সীতাকুণ্ড রেল স্টেশনসংলগ্ন বদরুল হাসানের বাসাটি (বঙ্গবন্ধু হল হিসেবে পরিচিত) ছিল সকল আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার। ছাত্রসমাজে মেধাবী, বিচক্ষণ ও সংগ্রামী ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তি ছিল বেশ সমুজ্জ্বল। নীতি-আদর্শের প্রশ্নে বদরুলভাই ছিলেন বরাবরই আপোসহীন। ১৯৭৮সালে সীতাকুণ্ডের জাফরনগর অপর্ণাচরণ উচ্চবিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি গঠনের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন রাজপথের লড়াকু সংগ্রামী ছাত্রনেতা, পরবর্তীতে সৈয়দপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ মঞ্জু।ওইসময় বদরুলভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয়।পরবর্তীতে সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজে প্রথম বর্ষে (১৯৮২)ভর্তি হয়ে বদরুলভাইয়ের রাজনৈতিক সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়।এসময় সীতাকুণ্ড কলেজ ছাত্রলীগের সম্মেলন ও নবীনবরণ অনুষ্ঠানে আ জ ম বদরুল হাসানকে আহবায়ক, শওকত হায়াত চৌধুরী (আলী চৌধুরীপাড়া, বাড়বকুণ্ড) ও আমাকে (মোহাম্মদ ইউসুফ) যুগ্ম-আহবায়ক করে সীতাকুণ্ড কলেজ ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠিত হয়।শুরু হয় বদরুলভাইয়ের সাথে আমার রাজনীতির পথচলা।অতঃপর জাতীয় রাজনীতির মাঠে তৈরি হয় ভিন্ন মেরুকরণ।বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে চেতনার অগ্নিমশাল জ্বালিয়ে আবদুর রাজ্জাক গঠন করলেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ(বাকশাল)।বাকশালের ছাত্রসংগঠন ছিল জাতীয় ছাত্রলীগ।সময়ের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে নবগঠিত জাতীয় ছাত্রলীগ এর রাজনীতিতে সামিল হই।বদরুলভাইয়ের রাজনৈতিক ছত্রছায়া থেকে সরে গিয়ে আলাদা প্লাটফরমে রাজনীতি করলেও আমাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কে চুলপরিমাণ ফাটল ধরেনি।১৯৮৬ সালে আমি শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হওয়ায় সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাই।বদরুলভাইও পরবর্তীতে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন।অবশ্য প্রথমে শিক্ষাজীবন শেষ করে বদরুলভাই কিছুসময় স্থানীয় হামিদুল্লাহহাট উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষকের দায়িত্বপালন করেছিলেন।রাজনীতির কারণেই চাকরিজীবনের প্রথম দিকে তাঁকে বহু সঙ্কট মোকাবেলা করতে হয়েছে। ঢাকা গেলেই আমার বিকেলের সময়টুকু কাটতো রমনায় অবস্থিত মৎস্যভবনে বদরুলভাইয়ের অফিসে। মাসে ২/১বার ৩/৪দিনের মতো ঢাকায় অবস্থানের কারণে তাঁর সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ় ও মধুর।মৎস্যবিভাগের সকল কর্মকর্তার অফিস ত্যাগের পরেই(সন্ধ্যা ৬/৭টা)বদরুলভাইয়ের অফিস ত্যাগকরা নিয়মে পরিণত হয়েছিল।অন্যদশজনের মতো বদরুলভাইয়েরও রানৈতিক উচ্চাভিলাস ছিল।কথাপ্রসঙ্গে তিনি আমাকে তাঁর সুপ্ত রাজনৈতিক বাসনার কথা বলতেন। স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে কিংবা অবসরে গিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে এমপি নির্বাচন করার স্বপ্নও তিনি দেখতেন। কিন্তু তাঁর সেই মরণরোগ সকল স্বপ্নকে হাওয়ায় মিশিয়ে দেয়। দীর্ঘদিনের সেই লালিত স্বপ্ন তিনি আর পূরণ করে যেতে পারেননি। বদরুল হাসান লেখালেখিতে বেশ সিদ্ধহস্ত ছিলেন।ছাত্রজীবনে তাঁর সুন্দরহাতের লেখা দেয়ালিকা ও পোস্টার ছিল বেশ নজরকাড়া। একসময় সীতাকুণ্ডের বারুদ ও গিরি-সৈকত পত্রিকায় বদরুল হাসান লিখতেন।এছাড়া জাতীয় বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণীতে জাতীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে লিখতেন।ঢাকাস্থ সীতাকুণ্ড সমিতির মুখপত্র “সহস্রধারা” কয়েকবছর ধরে আ জ ম বদরুল হাসান কর্তৃক সম্পাদিত হয়।তাঁর স্ত্রী সালমা আক্তার পাপিয়া একজন সাংস্কৃতিক কর্মী।মরহুম বদরুল হাসান একপুত্র ও এক কন্যাসন্তানের জনক। ছেলে মো. সালমান হাসান রাফি গুলশানের প্রেসিডেন্টশিয়াল ইউনিভার্সিটিতে বিবিএতে তৃতীয় সেমিস্টারে ও মেয়ে লাবিবা বুশরা রাজধানীর বারিধারার সাউথপয়েন্ট কলেজে প্রথমবর্ষে পড়াশোনা করছে। আজ ভাবতে বড় কষ্ট হয়, রাজনীতির চোরাবালিতে বদরুল হাসানের মতো ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিকেরা হারিয়ে গেছে। যে রাজনৈতিক সংগঠনের জন্যে বদরুল হাসানের এতো ত্যাগতিতিক্ষা সেই আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ মৃত্যূবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করে না, কবরে ফুল দেয় না।ভোগের রাজনীতি এখন ত্যাগীদের বেমালুম গেছে।আদর্শকে ঘিরে রাজনীতি থাকলে এমনটা হতো না। পরিশেষে মরহুম বদরুল হাসানের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং তাঁর ছেলেমেয়েরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বাবার সুনাম অক্ষুণ্ন রাখুক- সে-ই প্রত্যাশা করছি।

আর পড়ুন:   বরযাত্রীর নৌকায় বজ্রঘাতে ১৬ জনের  প্রাণহানি শিবগঞ্জে

লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম