৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

গোলাম সারোয়ার *

আবারো যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলা হলো। এবার হামলাকারীর বয়স একুশ। এবার টেক্সাসে ওয়ালমার্টের একটি স্টোরে বন্দুক হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক ২৪ জনকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিপদগামী তরুণেরা মাঝে মাঝেই সাধারণ নিরীহ মানুষের ওপর বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গত জুন মাসে ভার্জিনিয়ায় এক বন্ধুকধারী হামলা করে বারজনকে হত্যা করে। ফেব্রুয়ারিতে ইলিনয়ে হত্যা করে পাঁচজনকে। ফ্লোরিডায় হত্যা করে সতের জনকে। এ ফ্লোরিডাতেই ২০১৭ সালে এক ভয়াবহ হামলায় নিহত হয় পঞ্চাশ জন মানুষ ! এগুলো হলো বড় ঘটনা। ছোটখাটো ঘটনা সেখানে প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

গবেষকরা গবেষণা করে বের করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৬০ ঘণ্টায় একটি করে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেছে নেন স্কুল-কলেজ, ক্লাব-রেস্তোরা কিংবা শপিংমল। উদ্দেশ্য, কম সময়ে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নিরীহ মানুষ হত্যা করা। হার্ভার্ডের এক গবেষণায় ওঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ বাস করে, অথচ বিশ্বের ৩১ শতাংশ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে সেখানে। এর বিভিন্ন কারণ আছে। প্রথম কারণ হলো বন্দুকের সহজলভ্যতা।

পৃথিবীর যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকের সংখ্যা এবং সহলভ্যতা বেশি। দেশটিতে বর্তমানে প্রায়  ২৭ থেকে ৩১ কোটি বন্দুকের সরবরাহ আছে। লক্ষ্য করার বিষয়, দেশটিতে  জনসংখ্যাই হলো ৩২ কোটি। মানে সেখানে প্রায় প্রত্যেকেই একটি বন্দুক রাখতে পারে। গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, প্রতি এক-তৃতীয়াংশ পরিবারে অন্তত একজন বন্দুক বহন করেন। এটা হলো রেকর্ডের উপর নির্ভর করে গবেষণার ফলাফল। কিন্তু আমরা জানি রেকর্ডের বাইরের জগতেও বহু কিছু ঘটে থাকে। যে দেশে যত্রতত্র বন্দুক পাওয়া যায়, সেখানে অবৈধ অস্ত্রও থাকবে গণনার বাইরে বহু সংখ্যক।

দেশটির বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিডিসি-র রিপোর্ট বলে, দেশটিতে প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার লোককে হত্যা করে বন্দুকধারীরা। ট্রাম্প রিজিমে আসার পর ২০১৭ সালে এ সংখ্যা হয়ে যায় প্রায় ৪০ হাজার। গবেষণায় দেখা গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনা ঘটায় কিশোরেরা। অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফৌজদারি বিচার বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক এডাম ল্যাংকফোর্ড বলেন, ‘এখানকার প্রজন্মের অন্যতম লক্ষ্য হলো বিখ্যাত হওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের কিশোরেরা খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বড় হতে থাকে। এবং দেখা যায়, বন্দুক হামলার ওই সব ঘটনা ব্যাপক মিডিয়া কভারেজ পায়। আর এটা খ্যাতি অর্জনের পথ মনে করে তারা।‘

তবে আমরা মনে করিনা, অধ্যাপক এডাম ল্যাংকফোর্ডের ভাবনার মতো ঘটনা এত সরল। একটি উন্নতদেশে নিষ্ঠুরতার এত ব্যাপকতা কেন, তার কারণ আরো বিস্তৃত হতে পারে। আমরা জানি, যেকোনো সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় গণসমস্যার কারণ ঐ সমাজে বা রাষ্ট্রেই নিহিত থাকে। যে সমাজ নিজে নৈতিকতার ওপর থাকেনা তাদের সন্তানরা বেড়ে উঠে অনৈতিকতার ওপর। নৈতিকতা একটি বড় শক্তি। গায়ের জোরে কোনো জাতির ওপর যদি উৎপীড়ন চাপিয়ে দেয়া হয় তা নিজের ওপর  ফিরে আসবে আরো গতিবেগ নিয়ে। এবং তা আসবেই।

আর পড়ুন:   দু’মসজিদে হামলায় নিহত  ৪০- নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী

আজকে আমেরিকা যারা শাসন করছেন তারা প্রায় সবাই ইউরোপীয়। কিন্তু এ অঞ্চলটা হলো রেড ইন্ডিয়ানদের। ১৪৯২ সালে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের সময় যাদের ভুলে ইন্ডিয়ান ভেবে রেড ইন্ডিয়ান বলেছে তারা আসলে মায়া, ইনকা ও অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষগুলো। কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করে তখন প্রায় একশ মিলিয়ন আদিবাসী ছিলো সমগ্র আমেরিকাতে। ইউরোপীয়রা তাদের হত্যা করে নির্মূল করে ক্রমান্বয়ে। কখনো অস্ত্রের জোরে, কখনো মহামারী ছড়িয়ে গণহত্যার পর গণহত্যা করে আদিবাসীদের নির্মূল করা হয়। আজকের পৃথিবীতে তাদের সংখ্যা প্রায় শেষের দিকে।

আমেরিকা যখন আবিষ্কার হয় তখন সেখানে যেসব ইউরোপীয়দের পাঠানো হতো তারা ছিলো সে সময়ের অপরাধী। প্রাচীন এবং মধ্যযুগে অপরাধীদের নির্বাসন দেয়া হতো নতুন আবিষ্কৃত দুর্গম দ্বীপে । উদ্দেশ্য টিকতে পারলে সেসব অনাবাদী ভূমি আবাদযোগ্য হবে, আর না টিকতে পারলে তারা মিশে যাবে। ইউরোপ যখন আমেরিকা আবিষ্কার করে তখন তাকে বলা হতো নিউ ওয়ার্ল্ড। সেই নিউ ওয়ার্ল্ডে যেহেতু পাঠানো হতো সব নটোরিয়াস অপরাধীদের তাই ইউরোপীয়দের থেকে এরা আরো বেশি ভিন্নতর।

গত একশ বছরের পৃথিবীর সংঘাত সম্ভাবনার দিকে একপলক দৃষ্টি দিলেই আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সমস্যায় আমেরিকার অংশগ্রহণ আছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তারা তাদের ভূমিকে রেখেছে সেসব সংঘাতের বাইরে। প্রায় প্রতিটি যুদ্ধে তারা ছিলো কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধই তাদের মাটিতে হয়নি।

১৯১৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত ৪ বছর ১৩৩ দিন ব্যাপী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে আমেরিকা ছিলো মিত্রশক্তির একটি পক্ষ। যুদ্ধ হয় ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপসমূহ, চীন এবং ভারত মহাসাগর এলাকায়। সে যুদ্ধের উপস্থিতি আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত যেতে পারলেও তাদের ভূমি স্পর্শ করতে পারেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় দু’ কোটি মানবসন্তান নিহত হয়। এদের ভেতরে বেসামরিক প্রায় সবাই বাকী বিশ্বের।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয় ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ পর্যন্ত ৬ বছর, ১ দিন। সে যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র মিত্রশক্তির বড় একটি পক্ষ। এ যুদ্ধও হয় ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগর জুড়ে। এ সময়ও তাদের ভূমি থাকে প্রায় স্পর্শের বাইরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষকে হত্যা করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি ভূমিধ্বসী মহাযুদ্ধ। মানবসভ্যতার স্মরণকালের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি মানুষ এ সময় নিহত হলেও আমেরিকার বেসামরিক মানুষেরা তাদের ভূমিতে থাকে প্রায় নিরাপদ।

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, জাপান ৭ ডিসেম্বর, ১৯৪১ সালে যে পার্ল হারবারে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমান ঘাঁটিকে ধ্বংস করে দেয় তা ছিলো হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ। যুক্তরাষ্ট্রের এ রকম ঘাঁটি এখনো বিশ্বের বহু অঞ্চলে রয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত সেই হাওয়াই দ্বীপটি তখনো যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিলো না। সেটি ৫০তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে জয়েন করে ১৯৫৯ সালে।

আর পড়ুন:   ট্রাম্পের নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি

তারপর আসে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের কথা। সে সময়ে যত প্রক্সিযুদ্ধ হয়েছে, সেগুলোর ইন্ধনদাতা যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া হলেও যুদ্ধ হয়েছে অন্যরাষ্ট্রগুলোর ময়দানে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ হয় ১ নভেম্বর ১৯৫৫ সাল থেকে ৩০ এপ্রিল ১৯৭৫ পর্যন্ত ১৯ বছর, ১৮০ দিন। এই লম্বা যুদ্ধ হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে কিন্তু মারা যায় প্রায় অর্ধকোটি ভিয়েতনামী, কম্বোডিয়ান, লাওসী। বর্তমান পৃথিবীর জঙ্গীবাদের উত্থান হয়েছে আফগানিস্তান থেকে। সেটাও সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকাতে। সে সময় আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে অগণিত মাদ্রাসা সৃষ্টি করে মুজাহিদ সৃষ্টিতে অর্থ, অস্ত্র ও চিন্তা বিনিয়োগ করে তারাই।

আজকের যুগে ইরান, উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক বোমা বানানোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হলো যুক্তরাষ্ট্র। আমরাও মনে করি, এ প্রাণঘাতী মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে পুরো পৃথিবীকেই একাট্টা হতে হবে। কিন্তু আমরা মনে রাখবো, পৃথিবীতে মানবতার বিরুদ্ধে এ অস্ত্র একদেশই ব্যবহার করে। আর সে দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র।  হিরোসীমা ও নাগাসাকীতে দুই বোমাতেই তাৎক্ষণিক মারা যায় প্রায় আড়াই লাখ লোক এবং পরবর্তীতে আরো প্রায় সোয়া দুই লাখ।

যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান গবেষক জেমস লুকাস বলেছিলেন, বিশ্বব্যাপী নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে বছরে তিন লাখ মানুষ হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। আর গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর রিসার্চ অন গ্লোবালাইজেশন’ এর মতে, গত ৭৩ বছরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী ৩ কোটি মানুষকে হত্যা করেছে। এই হলো অবস্থা ! সেক্সপিয়ার বলেছিলেন, হত্যাই খুলে দেয় হত্যার দরজা।

কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতারা যখন কথা বলেন একটি আর কাজ করেন ঠিক উল্টোটি তখন তাদের বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কি হবে ? তারাতো কন্ট্রাডিকশনের ভেতরে বড় হবে। একটি দ্বিধাগ্রস্ত জাতি অবশ্যই বিপদগ্রস্ত হবে। সেই বিপদগ্রস্ততা থেকে কোনো জাতির মুক্তি নেই, যদি তারা সময়ের সাথে সমন্বয় না করে। ধর্ম যেটাকে বলে স্রষ্টার আদেশ আইন, বিজ্ঞান সেটাকে বলে রুল অফ নেচার। রুল অফ নেচারকে অতিক্রম করে গিয়ে মানবসভ্যতার কোনো অংশ ভালো থাকতে পারেনা। পৃথিবীর ইতিহাসে সে নজির নেই। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রকে ডিভাইন জাস্টিজে আসতেই হবে। কারণ নৈতিকতা আর ন্যায়বিচার ছাড়া পৃথিবীতে কারো মুক্তি নেই।

লেখক-গোলাম সারোয়ার, গবেষক ও কলামিস্ট।