৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ *

চট্টগ্রাম বন্দর প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা ও গাফিলতি সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এখানে নেই বললে চলে।বন্দরসংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের সততা ও আন্তরিকতা থাকলে এ সংস্থাটির জায়গা-জমি নিয়ে স্বার্থান্বেষী রাঘববোয়ালেরা এমন ছিনিমিনি খেলার সাহস পেতো না। সরিষায় ভূত থাকলে যেমন ভূত তাড়ানো যায় না- ঠিক তেমনি চট্টগ্রাম বন্দরেও ‘ভূত’ থাকায় জমিজমা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।বন্দরের অসাধু কর্তাব্যক্তিদের সাথে যোগসাজশের কারণে কালক্রমে অবৈধ দখলদারেরা এতই বেপোরোয়া হয়ে ওঠেছে যে, সীমানাপ্রাচীর দিয়েও বন্দরপ্রশাসন জমিদখল ঠেকাতে পারছে না। বন্দর প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চারমাস আগে উচ্ছেদের সময় গুড়িয়ে দেয়া ১০টি লবণ কারখানা ও গুদামঘর ফের নতুনকরে নির্মাণকাজ শুরু করে দিয়েছে অবৈধ দখলদারেরা। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সীমানাচিহ্ন ও বন্দরের সীমানাপ্রাচীরের ভেতর নতুনকরে টিনের স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে উচ্ছেদকরা জায়গায় অনেকগুলো অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠেছে।নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দায়িত্ব পুরোপুরি বন্দর কর্তৃপক্ষের হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। এদিকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাকারী সরকারি ভূমি কর্মকর্তাকে অসহায়ের মতো বলতে হচ্ছে- “ কত কষ্ট করে এ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিলাম। কিন্তু এখন সেখানে নতুন করে স্থাপনা গড়ে ওঠছে। উচ্ছেদ কার্যক্রমও এখন বন্ধ আছে।” গত ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের নির্দেশে কর্ণফুলী নদীর অভিযান শুরু হয়। সদরঘাট ও মাঝিরঘাট এলাকার প্রায় ২০একর জমি উদ্ধার করা হয়।উদ্ধার করে নদীর অংশ চিহ্নিত করে সীমানাখুঁটি দিয়েছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। উচ্ছেদ অভিযানের দৃশ্য দেখে সেদিন জনমনে আশার আলো জ্বলে ওঠলেও সহসাই তা নিভে যায়। কিন্তু উচ্ছেদ অভিযানের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষে তা বন্ধ করে দেয়া হয়।সেদিন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাজেট বরাদ্দ না থাকা ও নদীর তীর রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ শুরু হওয়ায় উচ্ছেদ অভিযান আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। এডভোকেট মনজিল মোরশেদের রীট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।তারই আলোকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন উচ্ছেদকাজ শুরু করেছিল। এছাড়া গত ৯এপ্রিল কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়েওঠা অবৈধ স্থাপনা একমাসের মধ্যে অপসারণ করতে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন আদালত। কর্ণফুলী নদীর উভয় তীরের মোহনা থেকে কালুরঘাটসেতু পর্যন্ত নদীর জলসীমা থেকে ১৫০ বর্গফুট তীরভূমির সকলপ্রকার ব্যবহার ও শাসন করার কর্তৃত্ব চট্টগ্রাম বন্দরের এস্টেট বিভাগের।বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিবিশেষ এ জায়গা ব্যবহার করতে চাইলে বন্দরের এস্টেট শাখার অনুমতি বাধ্যতামূলক। এ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের এস্টেট অফিসার জিল্লুর রহমান তাঁর দায়িত্বপালনে ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না। চট্টগ্রাম বন্দরে বহুল আলোচিত নাম জিল্লুর রহমান। বন্দরের ভূসম্পদ দেখভাল করার গুরুদায়িত্ব তার।চবক’র উপব্যবস্থাপক(এস্টেট)তিনি।অবৈধভাবে তার বিরুদ্ধে বন্দরের জমি-ঘাট-জেটি ইজারা দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিয়োগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্বিকার।বলা যায়,বন্দরের অঘোষিত জমিদার তিনি ; আছে নিজস্ব “লাঠিয়ালবাহিনী”।এস্টেট শাখার সকল কার্যক্রম তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। তার বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্য করার সাহস কারো নেই ;তার কথাই শেষকথা।বন্দরের জমিজমা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তার হলেও তিনি ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছেন। এ যেনো ‘শুঁটকির গুদামে বিড়াল-চৌকিদার’ এর মতো অবস্থা।শুধুমাত্র তার লাগামহীন দুর্নীতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।বন্দরের লোকালঘাট অবৈধভাবে ইজারাপ্রদান, পতিতজমিতে গড়েতোলা টিনশেডঘর ও বালুমহাল থেকে মাসোয়ারা আদায়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানান অনিয়ম-দুর্নীতির হাট বসিয়ে তিনি টাকার পাহাড় গড়েছেন-এমন অভিযোগ ওপেন-সিক্রেট।স্ত্রী ও নিজের নামে-বেনামে অঢেল অবৈধ সম্পদের কারণে ওয়ান-ইলিভেনের সময় যৌথবাহিনীর হাতে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন।দুর্নীতি দমন বিভাগের মামলার আলোকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হলেও আদালতের এক্সেটেনশন নিয়ে দাপটের সাথে তিনি দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বপদে বহাল আছেন।এ বন্দরে চেয়ারম্যান আসে, চেয়ারম্যান যায় কিন্তু জিল্লুর রহমানের এখান থেকে নড়চড় হয় না, নেয়া হয় না প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, জিল্লুর রহমানের খুঁটির জোর কোথায়;কারা তার গডফাদার! বন্দরের এ ভূসম্পদ শাখায় ঘুষ,দুর্নীতি,অনিয়ম, দীর্ঘসূত্রিতা ও হয়রানি নিয়মে পরিণত হয়েছে।তাই বন্দরের এ এস্টেট শাখাকে ঢেলে সাজানো জরুরি।বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরোটলারেন্স নীতি ঘোষণা করার পরও জিল্লুর রহমানেরা দুর্নীতির মহোৎসবে মেতে থাকবেন-এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বর্তমান নৌ-পরিবহনপ্রতিমন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন-এমন প্রত্যাশা ভুক্তভোগীদের।

আর পড়ুন:   ঝিনাইদহে বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১১

চট্টগ্রাম বন্দরের উপব্যবস্থাপক (এস্টেট) জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি ফোনে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয়। বন্দরের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বন্দরের জেটি-ঘাট-বালুমহাল ও পতিতজমি ইজারাপ্রদান করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এসব আজগবী গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়।এককভাবে শুধু আমি নয়, বন্দর চেয়ারম্যানও জমি ইজারা দিতে পারেন না।বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছাড়া এককভাবে কারো পক্ষে বন্দরের জমিজমা ইজারা দেয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। অন্যদিকে ঘাট-জেটির ইজারাতো আরো জটিল, টেকনিক্যাল বিষয়; এতে বন্দরের কয়েকটি বিভাগ জড়িত।এ ক্ষেত্রেও বোর্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।”

লেখক-প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডট.কম