৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

গোলাম সারোয়ার *

মানুষ আমাদের কাছে জানতে চায় কিভাবে সুখে থাকা যায়। এর উত্তর সহজ, আবার কঠিনও। এটা নির্ভর করে মানুষের মাইন্ডসেটের ওপর। মানে মানুষের নিজের উপর নির্ভর করে তিনি কিভাবে থাকবেন।

আপনি যদি দুঃখে থাকার পৃথিবী খোঁজেন তবে এখানে দুঃখজনক বহুকিছু আছে। আবার আপনি যদি ভালো থাকার পৃথিবীর খোঁজ করেন তবে এখানে ভালো বহুকিছু পাবেন। আপনি ভালো থাকবেন কিনা মন্দ থাকবেন, তা আপনার দায়, আপনার চয়েজ।

আমরা পরিবার থেকে শুরু করে সমস্ত পৃথিবীতে নৈতিকতার মানদণ্ডে ডাবলস্ট্যান্ডার্ড পন্থা অবলম্বন করে থাকি। এটাই হলো পৃথিবীর সমস্যার মূল কারণ।

পরিবারে যিনি বউ তিনি শাশুড়িকে যে দৃষ্টিতে দেখেন তিনি নিজে শাশুড়ি হলে বউয়ের থেকে সে রকম ব্যবহার আশার করেন না। বউ শাশুড়িকে যে দৃষ্টিতে দেখেন তিনি নিজের মাকে সে দৃষ্টিতে দেখেন না। আবার যিনি শাশুড়ি তিনি নিজের মেয়েকে যে দৃষ্টিতে দেখেন বউকে সে দৃষ্টিতে দেখতে প্রায় সময়েই ব্যর্থ হন।

রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে, শক্তিমান রাষ্ট্রগুলো অন্যদের থেকে যে রেসপন্স আশা করে তারা নিজেরা অন্যদের সাথে সে ব্যবহার করেনা। যে রাষ্ট্র নিজে পারমানবিক বোমা বানায়, পাহারা দেয়; তারাই অন্যের পারমানবিকা বোমা বানানোতে শঙ্কিত হন,  ভেটো দেন, চিৎকার করেন তারস্বরে। তাদের নিজেদের জন্যে যেটা বৈধ ভাবেন অন্যদের জন্যে সেটা অবৈধ ভাবেন।

ধর্মীয় বিবেচনার ক্ষেত্রে, কোনো রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু জনগণ সংখ্যালঘুদের সাথে যে ব্যবহার করেন তারা নিজেরা আরেক দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে সে ব্যবহার আশা করেন না। অর্থ্যাৎ পরিবার থেকে বিশ্বমঞ্চ পর্যন্ত দ্বৈতনীতিতে আছেন প্রায় সবাই।

আমরা ইদানিং, উদারতাবাদকে উপেক্ষা করে কট্টর রক্ষণশীল হওয়ার অপরাধে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যের হালের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনসন কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সমালোচনা করে থাকি।

কিন্তু উদারতাবাদকে এ আমলে সবচেয়ে বেশি যিনি উপেক্ষা করেছেন সেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সমালোচনা আমরা কখনো করিনা। পুতিন বহু আগেই উদারতাবাদকে সেকেলে বলে ছেড়ে দিয়েছেন, ছুড়েও দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘অভিবাসন, বহুসংস্কৃতিবাদ ও লৈঙ্গিক প্রশ্নে যে উদারতাবাদের কথা বলা হয়, তা হাস্যকর।’

আর পড়ুন:   জামায়াত নেতা আজহারুলের মৃত্যুদণ্ড বহাল

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ইস্যুতে কিংবা মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল দেয়ার কথা উঠলেই আমরা সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠি কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে চীন নামক একটি দেশ আছে তারা তাদের প্রায় ১৪০ কোটি মানুষকে বাকী বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, সে কথা আমরা কখনো বলিনা। বলিনা এ কারণে যে, সমাজতন্ত্রের প্রতি আমাদের এদিকে অনেক মোহ আছে। আমাদের শিক্ষকরা, লেখকরা সমাজতন্ত্রের জন্যে গোপনে ক্ষয়ে ক্ষয়ে কাঁদেন।

আমাদের অনেকে জানেওনা, চীনে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, গুগল বলতে কিছুই নেই। আছে শুধু ঐ এক জিনিস বিকৃত সমাজতন্ত্র। বিকৃত বললাম এই কারণে যে, সেখানে সমাজতন্ত্রের নামেই চলছে পুঁজিবাদ, আধিপত্যবাদ আর নিয়মতান্ত্রিক অভিজাততন্ত্র।

সমস্যা হলো আপনি এগুলো বলতে পারবেন না। আমাদের দেশে ফেসবুক একদিন বন্ধ রাখলে যিনি প্রথম প্রতিবাদ দিবেন যিনি হলেন একজন চীনপন্থী বাম রাজনৈতিক। ভোটের বিচ্যুতিতে যিনি কট্টর সমালোচক তিনি হলেন রাশিয়ান বাম রাজনীতির ধারক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রের বাহক। এটা দ্বিচারিতা।

আবার আমরা মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মের বিচ্যুতি নিয়ে অহরহ সমালোচনা করি কিন্তু পৃথিবীর যে রাষ্ট্র প্রকাশ্যে দশ লাখ লোককে কয়েদ করে রেখেছে ধর্মের কারণে সেটা হলো চীন। উইঘুর ঐ মুসলমানদের তারা বন্দী করে ধর্ম ভুলিয়ে দিতে চাচ্ছে। এ সংখ্যা এককভূমি হিসেবে একক কয়েদখানাতে ধর্মীয় উৎপীড়নে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ঘটনা। কিন্তু বামদলগুলো এর কোনো সমালোচনা করলেন না।

আমরা মনে করি, পৃথিবীতে শান্তি সম্ভব। এটা নির্ভর করে মানুষের মাইন্ডসেটের ওপর। আপনি ভালো থাকবেন কিনা মন্দ থাকবেন তা আপনার দায়, আপনার চয়েজ। ঈশ্বরের এখানে কোনো দায় নেই। কারণ ঈশ্বর সমস্ত জগতটির স্রষ্টা।

পৃথিবীতে যা কিছু ভালো শুধু তারই স্রষ্টা তিনি নন, পৃথিবীতে যা কিছু মন্দ তারও স্রষ্টা তিনি। চূড়ান্ত বিচারে জগতের সমস্ত ভালো মন্দ, পাপ পূণ্য, আচার অনাচার, আলো আঁধার, সমস্যা সম্ভাবনা সবকিছুরই স্রষ্টা তিনি। ধর্ম যাকে বলে স্রষ্টা, বিজ্ঞান তাকে বলে মহাবিশ্ব যার কর্মযজ্ঞ একই।

আর পড়ুন:   গুণী সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্ত আর নেই

জগতে ভালো থাকা মন্দ থাকা নির্ভর করে প্রতিটি এনটিটির মানসিকতার ওপর। জগতের বেশিরভাগ এনটিটি যদি ভালো থাকে তবে জগৎটা ভালো থাকবে।

সবচেয়ে ভালো হতো, যদি রাষ্ট্র প্রধান আর সরকার প্রধানরা ভালো থাকতো। নিগূঢ় সত্য হলো, পৃথিবীর কোনো শাসকই ভালো নেই। তাঁরা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় থাকেন। তাঁরা ভালো নেই বলেই জগত আরো বেশি ভালো নেই।

গোলাম সারোয়ার- কলামিস্ট