বাংলাদেশে একমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শেখ হাসিনা যিনি টানা তৃতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে ক্ষমতায় রয়েছেন। তাঁর তৃতীয়বারের মেয়াদের প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার (১৬ এপ্রিল)

শেখ হাসিনার সরকার তৃতীয় দফায় ক্ষমতা গ্রহণের পর ‘প্রথম ১০০ দিনে তেমন কিছু প্রকাশ্যে ঘোষণা না দিলেও পর্দার আড়ালে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তারা কে কেমন করছেন, কার মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি কতটুকু তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কর্মদক্ষতার পুনর্মূলায়ণের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি কোণঠাসা হয়ে থাকা  এবারের নির্বাচনীমাঠে দাঁড়াতেই পারেনি বিরোধী জোট।

যে আশায় বিরোধীশক্তি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তকমা লাগিয়ে মাঠ গরম করতে চয়েছিল, সে আশায় গুড়েবালি! ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে  ফসল তোলার পরিবর্তে বুমেরাং হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নামে যুগপৎ পথচলায়।

সরকারের অন্যতম নীতিনির্ধারক রাশেদ খান মেনন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং সাবেক মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ শান্তি চায়। দেশবিরোধী রাজনীতি আর হালে পানি পাবে না, তারই প্রমাণ ৩০ ডিসেম্বর। ওই নির্বাচনের পর দেশের অধিকাংশ মানুষ এখন সরকারের প্রতি আস্থা রাখছে। আন্দোলন আর ষড়যন্ত্র করার মতো শক্তি বিরোধী জোটের নেই এবং এটিই সরকারকে স্বস্তি দিয়েছে।’

তৃণমূলের হতাশ, শীর্ষ নেতৃত্বের জেল-সাজা আর সিদ্ধান্তহীনতায় অস্তিত্ব সংকটে এখন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। ফিকে হয়ে আসছে খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনও। ভাঙন স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াত ইসলামীতে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়েতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির পর প্রায় বেসামাল দলটি। আত্মগোপনে দলটির ছাত্র সংগঠন শিবিরের নেতাকর্মীরাও। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে বিশেষ আলোচনায় আসা গণফোরাম ছেড়ে সংসদে শপথ নিয়েছেন দলটির শীর্ষ দুই নেতা। যা গণফোরামকে বেকায়দায় ফেললেও নির্বাচন, সরকার গঠনের বৈধতায় রসদ জুগিয়েছে।

অপরদিকে, অরাজনৈতিক হলেও সরকারের ‘মাথাব্যথা’ নামক হেফাজতে ইসলাম এখন সরকারের-ই ডেরায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতির চরম বিরোধিতা করলেও কওমি শিক্ষানির্ভর হেফাজতে ইসলাম নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এখন সরকারের গুণ-কীর্তনে মশগুল।

বলা যায়, রাজনৈতিক শক্তির বিবেচনায় মহাজোট সরকারের এখন ‘দারুণ সময়’। বিশেষত, গত নির্বাচনের পর এ সরকারের প্রথম ১০০ দিন কেটেছে অনেকটাই ‘মধুচন্দ্রিমা’র আবহে।

অথচ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমনটি কখনই দেখা যায়নি। সরকার পরিবর্তন বা একই সরকারের ধারাবাহিকতা থাকলেও নির্বাচনের পরপরই রাজনীতিতে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করে। জ্বালাও-পোড়াও, খুন, ধর্ষণ নির্বাচনী সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল প্রায়। কিন্তু এবার বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সামগ্রিক পরিস্থিতি সরকারের অনুকূলে ছিল। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় সরকারের নেয়া একপেশে কৌশলই পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

আর পড়ুন:   রোহিঙ্গাদের নিরাপদে স্বদেশে ফিরতে আইডিবিকে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি দল ও শরিকরা যে আস্থা রেখেছেন, সেটাও সরকারের অবস্থান শক্ত করেছে। এ কারণেই মনে করা হয়, তৃতীয় দফা সরকার গঠন করে শেখ হাসিনা প্রভাবশালী মন্ত্রীদের বাদ দেয়ার পরেও ‘টু’ শব্দটি হয়নি। এত সংখ্যক বর্ষীয়ান রাজনীতিককে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেয়ার ঘটনা অদ্বিতীয়। যা সরকারের জন্য বিশেষ চ্যালেঞ্জও হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বরং খবর মিলছে, অনভিজ্ঞ তরুণ মন্ত্রীদের পথ চলায় সহায়তা করছেন বাদপড়ারা।

সরকারের নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাওয়ার গল্প বলে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। তিনি নতুন এক বাংলাদেশ উপহার দিতেই মন্ত্রিসভায় চমক দিয়েছেন। আমরা শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জ নেয়া পথের সঙ্গী হয়ে থাকতে চাই। এছাড়া দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অভিজ্ঞতা আর অনুপ্রেরণাও আমাদের পাথেয়।’

তবে সরকারের জন্য রাজনীতির আঙিনায় আপাতত স্বস্তির বার্তা থাকলেও, অনিশ্চিতাও কম নয়। সংসদে সত্যিকার বিরোধী শক্তির প্রতিনিধিত্ব না থাকা, জবাবদিহিতা না থাকা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য যে সুখকর নয়, তা অনেকেই মনে করছেন। বিশেষত নারী নির্যাতনের বিষয়টি সমাজের সার্বিক চিত্রের প্রতিফলন হয়ে সামনে আসছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আপনি গণতন্ত্র, রাজনীতি আড়াল করে কিছুই টেকসই করতে পারবেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছে। জবাবদিহিতা নেই কোথাও। গণতন্ত্র নাজুক থাকলে এমনটিই হয়। সরকারে আপাতত স্বস্তি মিললেও এ পরিস্থিতি টেকসই উন্নয়নের সহায়ক হতে পারে না। যেকোনো সময় রাজনৈতিক, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।’

সরকারের সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘নুসরাত হত্যাসহ নারী নির্যাতনের বিষয়টি আমাদের চরমভাবে বিব্রত করেছে। বিব্রত করেছে সড়কে নিরাপত্তার বিষয়টিও। এটি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জও বটে। তাছাড়া সব কিছু সরকারের অনুকূলে আছে বলে আমি মনে করি।’

তবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন, ভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের অনীহার বিষয়টিও ভাবিয়ে তুলেছে। ভোট থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিলে গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ভালো খবর নয়। মানুষকে আস্থায় আনা সরকারেরই দায়িত্ব।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত কিছু করে দেখাতে হবে। প্রথম তিন মাস কিংবা ১০০ দিনের মধ্যে সরকারের এমন কিছু কর্মসূচি নেয়া উচিত ছিল যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকার সম্পর্কে ভালো ধারণা জন্মায়।

আর পড়ুন:   মনোনয়ন দাখিলের আজ শেষদিন

৫ বছর মেয়াদের বর্তমান সরকারের ১০০ দিন পেরিয়ে গেছে। এ সময়ের সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে সামনে বিশ্লেষণ হবে। তবে সামনে পড়ে রয়েছে আরো বিস্তর সময়। সেই সামনের সময়গুলোতে কি করবেন সেটাই দেখার জন্য দেশবাসীর অপেক্ষার পালা।

মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, বর্তমান সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের কাজের হিসাব নেয়া প্রয়োজন। এবার সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অনেক নতুন মুখ এসেছে। তিন মাসে কাজের মূল্যায়ন করা অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর যে পর্যবেক্ষণ সেটাকে তিনি আরও নিবিড় করবেন। এতে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে। ৭ জানুয়ারি নতুন সরকারের মন্ত্রীরা শপথ নেন। এখন সরকারের ১০০ দিন মেয়াদের মধ্যেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মপন্থা নির্ধারণ করে কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী কেমন করছেন সে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। বিগত সরকারের সময়ে কয়েকজন বিতর্কিত মন্ত্রীর কারণে বিব্রত হওয়ায় এবার মন্ত্রীদের সবাই ওপর কঠোর পর্যবেক্ষণ চলছে। সচিবালয় বিটের সাংবাদিকদের দৃষ্টিতে সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের অনেকেই মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি বাড়াতে উদ্যোগী ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা নীরবে কাজ করে চলেছেন। অনেকের কাজ প্রশংসিতও হচ্ছে। তবে কোনো কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর ক্ষেত্রে কাজের কিছুটা ছন্দপতন দেখা গেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সহানুভুতি ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তেমন সাফল্যের দেখা নেই। কিছু মন্ত্রণালয়ের কাজ দেখা গেছে গতানুগতিক।

গত ২১ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় মন্ত্রিসভা সদস্যদের হুঁশিয়ার করে দেন। তিনি বলেছেন, ‘অর্থ, বিত্তবৈভব সবই করতে পারবেন। কিন্তু পচে যাবেন। নিজেদেরকে কোনো রকম অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়াবেন না। সবার খবর আমার কাছে আছে’। তাঁর ওই বক্তব্যের পর মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য সতর্ক হয়ে যান। নতুন সরকার গঠনের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ড দেখতে মন্ত্রণালয়গুলো পরিদর্শন শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইতোমধ্যে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দিক-নির্দেশনাও দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিবসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের।