১০ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৬শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

এ দেশে ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর একমাত্র ২০০১ সালের নির্বাচন ব্যতীত অন্য সব নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য দেখা গেছে। অতীতে এর আগে অন্তত তিনবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে আলোচনা কিংবা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে; যার মধ্যে দু’বার হয়েছে বিদেশিদের মধ্যস্থতায়। গতকাল (৩১ অক্টোবর) বিবিসি বাংলা এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে।

১৯৯৪ সালের আলোচনা : ১৯৯৪ সালে মাগুরার একটি সংসদীয় উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে আনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সামনে আনে আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তারা জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে। হরতাল এবং সহিংসতায় জনজীবন তখন বিপর্যস্ত। তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা এবং গণতন্ত্র সংহত করতে কমনওয়েলথের তরফ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়।

কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকায় আসেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টেফান। কিন্তু সে আলোচনাও সফল হয়নি। স্টেফান তখন ঢাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। একপর্যায়ে তিনি সর্বদলীয় একটি সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সে সরকারে সরকার এবং বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া একজন টেকনোক্রেটমন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন কমনওয়েলথ মহাসচিবের দূত; কিন্তু আওয়ামী লীগ সে ফর্মুলা মানেনি।

স্যার নিনিয়ান স্টেফানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও তুলেছিল আওয়ামী লীগ। কোনো রকম সমাধানে না আসার কারণে ফিরে যান স্টেফান। এরপর আওয়ামী লীগ তাদের আন্দোলন আরও জোরদার করে এবং বিএনপি নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি একতরফা এবং বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অবশ্য সে নির্বাচনের পর সংবিধান সংশোধনের করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এর কয়েক মাসের মধ্যে আবারও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আর পড়ুন:   বুয়েটের হলে ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

আবদুল জলিল ও আবদুল মান্নান ভূঁইয়া সংলাপ : ২০০৬ সালের অক্টোবর তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল সংসদ ভবনে সংলাপে বসেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশন সংস্কারের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ একটি প্রস্তাব তুলে ধরে। প্রথম দিনের আলোচনা শেষে বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া বলেন, ‘১৪ দলের পক্ষ থেকে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদের যে দাবিগুলো আছে, সেগুলো আমার কাছে হস্তান্তর করেছেন। আমি তাদের প্রত্যেকটি দাবি সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়েছি। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। আমি এ ব্যাখ্যাগুলো নিয়ে আমার দলের কাছে ফেরত যাব এবং দলের সঙ্গে আলোচনা করব।’

এ সময় আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার পাশে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল। তিনিও একই কথা বলেন। প্রথম বৈঠকের পর তারা জানিয়েছেন, আলোচনা আরও চলবে। তখনকার সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানায়, আওয়ামী লীগের তরফ থেকে দুটি দাবিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়। প্রথমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে সাবেকপ্রধান বিচারপতি কেএম হাসানের না থাকা এবং দ্বিতীয়ত, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে এমএ আজিজের পদত্যাগ। কিন্তু এ দুটি বিষয়ে বিএনপির দিক থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া আসেনি।

একদিকে আওয়ামী লীগ রাস্তায় আন্দোলন করতে থাকে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি ২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে থাকে। আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখ বিচারপতি কেএম হাসান প্রধান উপদেষ্টার পদ নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ফলে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে নেন। একপর্যায়ে বিরোধী রাজনৈতিক জোট নির্বাচন থেকে সরে যায়। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে সে নির্বাচন স্থগিত হয়। ফলে প্রায় দুই বছর সেনাসমর্থিত সরকার দেশ পরিচালনা করে।

অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতা : ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর থেকে সে ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিএনপির দিক থেকে আন্দোলনের হুমকি দেয়া হয়। ২০১৩ সালের শুরুতে সে আন্দোলন জোরালো রূপ নেয়। বিরোধী দল বিএনপির ডাকা হরতাল-অবরোধের কারণে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। দেশজুড়ে এসময় সহিংসতাও হয়েছে।

আর পড়ুন:   ডিবি পরিচয়ে প্রতারণা, গ্রেপ্তার ৪

এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের প্রথমদিকে বাংলাদেশ সফরে আসেন জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। ততদিনে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে। তারানকো ঢাকা অবস্থানকালে বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বিবিসিকে জানায়, শেখ হাসিনাকে সরকারপ্রধান রেখেই নির্বাচনের একটি ফর্মুলা বের করার চেষ্টা করছেন জাতিসংঘের প্রতিনিধি; কিন্তু বিএনপি সে বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। তারানকো তার সফরের সময় বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর পাশাপাশি বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও তিনি বৈঠক করেন। তিনি আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সঙ্গে নিয়ে একটি বৈঠক করেন। কিন্তু উভয়পক্ষ তাদের দাবিতে অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান ছাড়াই ফিরে যান তারানকো। যাওয়ার আগে সোনারগাঁও হোটেলে এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, উভয়পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছে; কিন্তু তারানকোর কথায় পরিষ্কার আভাস মিলেছিল, রাজনৈতিক অচলাবস্থার কোনো সমাধান সূত্র বের হয়নি। এর ফলশ্রুতিতে আসে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত এক নির্বাচন।