৮ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৪শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

‘রাজনীতি মানেই কি বিরোধীদলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয় দলকে নেতৃত্ব শূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা।’ এমন পর্যবেক্ষণ ওঠে এসেছে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের মহাসমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় করা হত্যা মামলার রায়ে।

বুধবার (১০ অক্টোবর) পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে অবস্থিত ঢাকার ১নম্বর অস্থায়ী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করার পর জাতীয় চার নেতাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে না গিয়ে বহমান থাকে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শনিবার আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়। ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করানো হবে’- এই উদ্বৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সহায়তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটনাস্থল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাযালয় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর সম্মুখে যুদ্ধে ব্যবহৃত স্পেশালাইজড মারণাস্ত্র, আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটনা ঘটানো হয়। প্রশ্ন উঠে- কেন এই মারণাস্ত্রের ব্যবহার? রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয় দলকে নেতৃত্ব শূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা। রাজনীতিতে অবশ্যম্ভীভাবে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীদলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্ব শূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে দলই থাকবেন, বিরোধীদলের প্রতি তাদের উদার-নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা মোটেই গণতান্ত্রিক চিন্তা বহিঃপ্রকাশ নয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সাধারণ জনগণ এ রাজনীতি চায় না। সাধারণ জনগণ চায় যে কোনো রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশে যোগ দিয়ে সেই দলের নীতি, আদর্শ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ধারণ করা। আর সেই সভা-সমাবেশে আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এ ধারা চালু থাকলে পরবর্তীতে দেশের সাধারণ জনগণ রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়বে। অত্র আদালত চায় না, সিলেটে হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর দরগা শরীফের ঘটনার, সাবেক অর্থমন্ত্রী এস এম কিবরিয়ার ওপর নৃশংস হামলার, রমনা বটমূলে সংঘটিত বোমা হামলার এবং অত্র মোকদ্দমার ঘটনায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর নৃশংস বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার পুনরাবৃত্তির।

আর পড়ুন:   হাইকোর্টমোড়ে বিএনপির বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ

আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, সাক্ষী ও আসামিদের জবানবন্দি সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, মূল ঘটনার পূর্বে বিভিন্ন ঘটনাস্থলে অত্র মোকদ্দমার আসামিগণ অভিন্ন অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সভা করে পরিকল্পিতভাবে অত্র মোকদ্দমার ঘটনাস্থল ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সামনে ঘটনার তারিখ ও সময় মারাত্মক সমরাস্ত্র আর্জেস গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আওযামী লীগের নেতাকর্মীসহ ২৪ জনকে হত্যা করে ও শতাধিক নেতাকর্মীকে মারাত্মকভাবে জখম করে মর্মে আসামিগণের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসিকিউশন পক্ষ প্রমাণে সক্ষম হয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে আসামিগণকে শাস্তি প্রদাণ করা যুক্তিসঙ্গত বলে অত্র আদালত মনে করেন।২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় করা হত্যা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

গ্রেনেড নিক্ষেপ ও বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অপরাদের সহায়তা করা ও নিহতদের হত্যা অভিযোগে ১৯৮০ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যের ৬ ধারা দোষী সাব্যস্ত করে বাবরসহ ১৯ আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তাদেরকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

এ ছাড়া যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ আসামিকে দণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ আসামি হলেন

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম, আবদুস সালাম পিন্টু, মাওলানা মো. তাজউদ্দীন, মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মো. আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে মো. ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ, মাওলানা শওকত ওসমান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান, মাওলানা আবু সাঈদ, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ, রফিকুল ইসলাম, উজ্জ্বল ওরফে রতন ও হানিফ।

আর পড়ুন:   ‘এ সরকার আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপকেও হার মানিয়েছ ’

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এ ১৯ আসামিকে আবার ১৯৮০ সালের বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ৪ ও ৬ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছর কারাদণ্ড ও আরও জরিমানা ৫০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ আসামি হলেন

তারেক রহমান ওরফে তারেক জিয়া (পলাতক), হারিছ চৌধুরী (পলাতক), শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফের আবু ওমর আবু হোমাইরা ওরফে পীরসাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, আরিফ হাসান ওরফে সুজন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, আবুবকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ, মহিবুল মোত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন (পলাতক), আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন (পলাতক), মো. খলিল (পলাতক), জাহাঙ্গীর আলম বদর (পলাতক), মো. ইকবাল (পলাতক), লিটন ওরফে মাওলানা লিটন (পলাতক), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ (পলাতক), মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক), মুফতি আবদুল হাই (পলাতক) এবং রাতুল আহম্মেদ বাবু (পলাতক)।

দণ্ডপ্রাপ্ত এ ১৯ আসামিকে যাবজ্জীবন ছাড়াও ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ৩ ও ৪ ধারায় সাব্যস্ত করে আরও ২০ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।