৮ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৪শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

জনসাধারণকে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখতে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৮ এর চূড়ান্ত খসড়ায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের চরম অবমূল্যায়ন করে অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) এর ব্যানারে শুক্রবার (৬অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় শত শত ফিজিওথেরাপি পেশাজীবী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয় ।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ফিজিওথেরাপি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম বাস্তবভিত্তিক বিজ্ঞানসম্মত, স্বাধীন স্বতন্ত্র নিরাপদ ও কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি । সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন কারণে অসুস্থতা থেকে সুস্থ ও কর্মক্ষম হওয়ার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার কার্যকারিতায় প্রতিনিয়ত সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন । কিন্তু বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৮ এর চূড়ান্ত খসড়ায় ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীদের অবমূল্যায়ন ও দমন করার উদ্দেশে বিভিন্ন রকমের অনেকগুলো অসঙ্গতি বিদ্যমান রাখা হয়েছে । এই অসঙ্গতিগুলো রেখে আইন করা হলে, একদিকে দেশের জনগণ মানসম্মত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে, অন্যদিকে ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীরা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে যেমন ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীর পরিবর্তে তারা হবে শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন পেশাজীবী, অর্থাৎ  প্রতিবন্ধিতা ছাড়া ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকেরা অন্য কোনো ধরনের রুগী বা সমস্যা যেমন বাত, ব্যথা, স্পোর্টস ইঞ্জুরিসহ শরিরের প্রায় সব সমস্যায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও শুধু এই আইনের কারনণ তাদের দেখতেও পারবেনা এমনকি তাদের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাও দিতে পারবেনা । যা বিশ্বের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত বলে পরিচয় পাবে ।

মানববন্ধনে বক্তারা নিচের অসঙ্গতিসমূহ তুলে ধরে বক্তব্য প্রদান করেন ।

১. প্রস্তাবিত থেরাপি এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন আইন-২০১৭ সংশোধনের নামে সম্পূর্ণ নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে এবং পূর্বের খসড়ায় পেশাজীবী সংগঠন থেকে দেওয়া কোনো সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, বর্তমান প্রস্তাবিত খসড়া প্রণয়ন কমিটিতে পেশাজীবীদের কোনো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং পেশাজীবী সংগঠন এর পক্ষ থেকে এর উপর মতামত প্রদান এর কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং অতি গোপনিয়তার সাথে চূড়ান্ত খসড়ায় ফিজিওথেরাপি পেশা ও পেশাজীবীদের অবমূল্যায়ন ও দমন করার সবধরনের অসঙ্গতিপূর্ণ ধারা রাখা হয়েছে।

আর পড়ুন:   মহাকাশে আমরাও একদিন উড়ব : প্রধানমন্ত্রী

তারা এর তীব্র নিন্দা জানান ।

২. Physical Therapist works in the health sphere of promotion,  prevention, treatment/intervention, habilitation and re-habilitation – source –WCPT) অথচ প্রস্তাবিত রিহ্যাবিলিটেশন আইন দ্বারা ফিজিওথেরাপি পেশাকে শুধুমাত্র  রিহ্যাবিলিটেশন এর মধ্যে সংকীর্ণ করা হয়েছে-যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল এমনকি পৃথিবীর কোনো দেশেই রিহ্যাবিলিটেশন আইনে ফিজিওথেরাপি পেশা অন্তর্ভুক্তি নেই। উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে  ভারতে প্রণীত রিহ্যাবিলিটেশন আইনেও ফিজিওথেরাপি অন্তর্ভুক্ত নেই । প্রস্তাবিত এই আইনের কারণে দেশের জনসাধারণ মানসম্মত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে এবং ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীরা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তাই তারা খুবই উৎকণ্ঠিত ।

৩. WHO  ও WCPT’র মতে ফিজিওথেরাপি একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র পেশা এবং এর ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের প্রায় সব দেশে ফিজিওথেরাপির জন্য স্বতন্ত্র আইন বিদ্যমান থাকা স্বত্তেও প্রস্তাবিত  রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলে তা অনপুস্থিত, যার ফলে ফিজিওথেরাপি পেশার অবমাননা এবং ফিজিওথেরাপিস্টদের চরম অবমূল্যায়ন করা হয়েছে । তাই এই কাউন্সিল সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য ।

৪. সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকগণ বিভিন্ন সময়ে ফিজিওথেরাপিস্টদের জন্য আইন করার কথা বললেও প্রস্তাবিত ১৯ পৃষ্ঠার মুল আইনে ফিজিওথেরাপি পেশা, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং ফিজিওথেরাপি সংগঠন বলে একটি শব্দও অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি । যাহা এ পেশার  সাথে সংযুক্ত ফিজিওথেরাপি পেশাজীবী ও রুগিদের অধিকারকে হরণ করা হয়েছে-যা সম্পূর্ণ অমানবিক ।

ফিজিওথেরাপি সংযুক্ত করে এ রিহ্যাবিলিটেশন আইন করা হলে বাংলাদেশে ১৯৬০ সাল থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হওয়া ৫৮ বছরের ফিজিওথেরাপি পেশা ও পেশাজীবীদের অস্তিত্ব বিলিন হয়ে যাবে ।  যার ফলে একদিকে যেমন  ফিজিওথেরাপি পেশাজীবী তৈরির বন্ধ হবে অন্যদিকে জন সাধারণ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে।

উল্লেখ্য, আমাদের কয়েক যুগের দাবি ও আন্দোলনের জন্য সরকার ২০১৪ সালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের জন্য স্বতন্ত্র কাউন্সিল প্রনয়নকল্পে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এবং ফিজিওথেরাপির জন্য স্বতন্ত্র কাউন্সিল তৈরির বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্ট ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতির নির্দেশনা থাকা স্বত্তেও কাদের ইন্ধনে ফিজিওথেরাপি পেশাকে ধ্বংস করার জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলে ফিজিওথেরাপি পেশাকে তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ।

আর পড়ুন:   ঢাবি’র ছাত্রী ধর্ষণ ঘটনার মুলহোতা গ্রেপ্তার

সুতরাং ফিজিওথেরাপি পেশা ও ফিজিওথেরাপিস্টদের অবমূল্যায়ন, দমন ও নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতে এবং দেশের জনগণকে মানসম্মত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রদান করতে মুল আইনের বাহিরে প্রদত্ত তফসিল থেকে ফিজিওথেরাপি পেশাজীবী ও ফিজিওথেরাপি সেবাজীবীসহ এর সাথে সংশ্লিষ্ট সব অংশ বাদ দিতে হবে এবং অবিলম্বে স্বতন্ত্র ফিজিওথেরাপি কাউন্সিল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের স্বাস্থ্যসেবার সাথে সাংঘর্ষিক এ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলে যদি ফিজিওথেরাপি পেশা, ফিজিওথেরাপিস্টদের জোর করে অন্তর্ভুক্তি রেখে আইন প্রনয়নের চেষ্টা করা হয়, তাহলে ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীরা জনগণকে সাথে নিয়ে অনশন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রীকে ঘেরাও, বিক্ষোভ ও রাজপথের অন্যান্য  আন্দোলনসহ আর কঠোর কর্মসূচী দেওয়া হবে।

উক্ত মানববন্ধনে বক্তব্য প্রদান করেন, বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) সভাপতি ডা. দলিলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ডা. ফরিদ উদ্দিন, সহসভাপতি ডা. আরিফ জুবায়ের, যুগ্ম সম্পাদক ডা. মাসুক রায়হান উপল, ডা. মহসিন কবির লিমন, ডা. আকশাফুল ইমাম, পেশাজীবী ও শিক্ষকদের পক্ষে  ডা. মোহাম্মদ আলী, ডা. শান্তনু মল্লিক, ডা. মোঃ শাহরুম, ডা. সাইফুল ইসলাম, ডা. নাহিদ,ডা. আকলিমা চৌধুরী আশা,  শিক্ষার্থীদের পক্ষে জাকারিয়া তমাল, মারুফা তান্নি প্রমুখ।