৮ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৪শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্তর্নিহিত উপাদান ও সংবিধান বিধৃত মুক্তচিন্তা ও বাক্-স্বাধীনতার জন্য ব্যাপকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধারা অন্তর্ভুক্ত রেখে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাস হওয়ায় গভীর উদ্বেগ পুনর্ব্যক্ত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস ২০১৮ উপলক্ষে বুধবার (২৬সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধনে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’ কে কালো আইন হিসেবে উল্লেখ করে আইনটিতে এ পর্যায়ে সম্মতি প্রদান না করে আইনটির বিতর্কিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ধারাসমূহ পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদে ফেরত পাঠানোর জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট আবেদন জানিয়েছে টিআইবি।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতা ও বাক-স্বাধীনতা মানুষের অপরিহার্য অধিকার উল্লেখ করে মানববন্ধনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তথ্য অধিকার আইন একটি ব্যতিক্রমধর্মী আইন যা সরকার, জনপ্রতিনিধি ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে ক্ষমতা প্রদান করেছে এবং এ জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পূর্বশর্ত হলো চাহিদা অনুযায়ী যথা নিয়মে তথ্যের প্রদান। আইনটির প্রয়োগে সরকারের উদ্যোগ- যেমন তথ্য বাতায়নের মাধ্যমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত তথ্য জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং এর সাথে তথ্য অধিকার আইনকে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য প্রকাশকারী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান- প্রভৃতি ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক। তবে একই সাথে সরকারের নেতিবাচক ও হতাশাব্যঞ্জক উদ্যোগও লক্ষণীয়। সম্প্রতি বেশকিছু আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে যার মাধ্যমে বাক্্-স্বাধীনতা আগের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষুণ্ন হয়ে আসছে। আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার রূপান্তর হিসেবে সম্প্রতি সংসদে অনুমোদিত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আইনটি শুধু বাক্-স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায়ই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না, গণমাধ্যমকর্মীসহ বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত বিভিন্ন ব্যক্তি যারা সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে গবেষণা করে তার ওপর ভিত্তি করে সরকারকে জবাবদিহিতার জন্য পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছেন, তাদের জন্যও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। ঔপনিবেশিক সময়ের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় নতুন করে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত পশ্চাদমুখী উল্লেখ করে ড. জামান বলেন, সাংবাদিক বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য বড় ধরনের হুমকি ও নিরাপত্তহীনতা সৃষ্টি হবে এ আইনটির ফলে।

আর পড়ুন:   আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে হবে
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখছেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল যে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এ ধরনের আইন প্রণয়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে ড. জামান বলেন, আইনটি দেশে গণতন্ত্র বিকাশের পথে বিরাট প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে, মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করবে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে সকল নাগরিকের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতাবোধ সৃষ্টি করবে। স্বল্প মেয়াদে সরকারের জন্য উপযোগী বিবেচনা করা হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ও চূড়ান্ত বিবেচনায় আইনটি বুমেরাং বা আত্মঘাতী প্রতীয়মান হবে উল্লেখ করে ড. জামান মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আবেদন করেন, সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতা বলে আইনটিতে এ পর্যায়ে সম্মতি প্রদান না করে বিতর্কিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ধারাসমূহ পুনর্বিবেচনা করার জন্য যেন সংসদে ফেরত পাঠানো হয় এবং সংশ্লিষ্টজনের মতামত সাপেক্ষে আইনটি সংশোধন করা হয়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতে অবশ্যই আইনের প্রয়োজন আছে, তবে সে আইন নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির জন্য নয় উল্লেখ করে ড. জামান বলেন, আইনটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নিবর্তনমূলক ধারা অন্তর্ভুক্ত থাকায় মৌলিক অধিকার হরণের ব্যাপক সম্ভাবনার কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। সরকার ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন নিশ্চিতের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি সেক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টসমূহ অর্জনে সরকারের পাশাপাশি জনগণ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকাও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এ মানববন্ধনে টিআইবি কর্মীবৃন্দ ছাড়াও টিআইবি’র অনুপ্রেরণায় ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ইয়েস গ্রুপের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া গতকাল টিআইবি ও তথ্য কমিশনের যৌথ উদ্যোগে টিআইবি’র ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে বাংলাদেশ স্কাউটস, বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ৫২ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবকের অংশগ্রহণে তথ্য অধিকার আইন বিষয়ক এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় উপস্থিতি ছিলেন প্রধান তথ্য কমিশনার মরতুজা আহমদ, তথ্য কমিশনার নেপাল চন্দ্র সরকার ও টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় পর্যায় ছাড়াও টিআইবি’র অনুপ্রেরণায় গঠিত দেশের ৪৫টি সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) অঞ্চলে তথ্য ও পরামর্শ ডেস্ক, মানববন্ধন, র‌্যালি, সেমিনার, দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন প্রদর্শনী ও পথনাটকসহ বিভিন্ন দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।