৮ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৪শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

গোলাম সারোয়ার* রাজনীতির মাঠ এতদিন বন্ধ্যা ছিলো আরবের মরুভূমির মতো। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ গরম হয়ে ওঠতেছে। এটি খারাপ না। এদেশের মানুষের প্রধান বিনোদন রাজনীতি। এদেশের খেটে খাওয়া মানুষেরা পর্যন্ত সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যার পর তেমোহনীর দোকানে এসে চা খায় আর রাজনীতির খবরা খবর নেয়। বহুদিন পর বটতলাগুলো জমে ওঠেছে।

রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক নয়া-যুক্তফ্রন্ট। সাধারণ মানুষেরা বলে, আরে, এতো পিকনিক পার্টি ! আমরা অবশ্য তেমন বলতে পারিনা, কারণ জনসমর্থনহীন হলেও তাঁরা প্রত্যেকে দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাঁরা শখ করে কিছু দিন হম্বতম্বি দিবে, মিডিয়াগুলো দৌঁড়ঝাঁপ করবে, তবেইনা নির্বাচন।

আমরা শুধু এটুকু বলি, রাজনীতিতে তাঁদের প্রত্যেককে মানালেও গণতন্ত্রের জন্যে বিলাপ তাঁদের মানায় না। সত্য হলো, গণতন্ত্রের জন্যে কান্না বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলকেই মানায় না।

নয়া যুক্তফ্রন্টের প্রত্যেকে নিজের হাতে সাড়ে তিন হাত। প্রত্যেকে নিজ নিজ দলের সর্বপ্রথম, সর্বশেষ এবং একমাত্র ব্যক্তি, যারা প্রত্যেকে আজীবন নিজ দলের প্রধান থাকবেন। গণতন্ত্রের প্রশ্নে এদেশের আওয়ামী লীগ বিএনপি যা যুক্তফ্রন্টও তা। নিজ দলে যেখানে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব নেই, সেখানে দেশে কীভাবে গণতন্ত্র দিবেন!

আরেক আশ্চর্য বামদলগুলোর গণতন্ত্রের জন্যে মরা কান্না ! বামদলের জন্মই হয়েছে সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ আর গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে করতে। বামদলের রাজনৈতিক দর্শনের সাথে গণতন্ত্রতো যায়না, যেমন যায়নি মার্কস লেলিনের সোভিয়েত রাশিয়ায়, মাওয়ের চীনে, ক্যাস্ট্রোর কিউবায়। বামদলের রাজনৈতিক দর্শন হলো, একদল আজীবন ক্ষমতায় থাকবে। সে দলের বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দটি করলে তার জিব টেনে ছিঁড়ে ফেলবে। অথচ কী আশ্চর্য, এদেশের বামদলগুলো গণতন্ত্রের জন্যে বিলাপ করে! আমি নিশ্চিত এদের প্রত্যেকের বাম-ঈমান খারিজ হয়ে গেছে।

আর থাকে ডানদলগুলো ! এও এক আশ্চর্য ! ইসলাম ধর্মের সাথেও গণতন্ত্র যায়না। একটি আয়াত স্মরণ করা যায়। ‘যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথামতো চলো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।’ (সুরা আন আম, আয়াত ১১৬)

আর পড়ুন:   প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান হওয়া দরকার

আরো আছে। যেমন, ‘যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী সমাধান করে না, তারাই কাফির, জালিম ও পাপাচারী।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত ৪৪-৪৬)। কোরআনের এরকম আরো বহু আয়াত এনে প্রমাণ করা যায়, গণতন্ত্রের সাথে ধর্মের সম্পর্ক থাকতে পারেনা। যেসব আলেম ধর্মীয় রাজনীতি করে এবং গণতন্ত্রের জন্যে শ্লোগান মিছিল দেয় তাদের ঈমান খারিজ হয়ে যাবে যেহেতু এটি কোরআনের আয়াতের বিরোধী। কিন্তু আফসোস হলো, এদেশের বহু ইসলামী দল গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট করে বসে আছে !

তবে কি আমাদের নয়া যুক্তফ্রন্টের কোন আশা নেই ! উত্তর হলো ‘না নেই’। পুরোনো প্রবাদ হলো, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে এবং চালাতে বন্দুকের নল লাগে। বর্তমানে এই প্রবাদ পুরোধা চলেনা। বারাক ওবামার একটি কথা আমার মনে ধরেছিলো। তিনি একবার বলেছিলেন, দুনিয়া আমেরিকাকে সমীহ করে, এটি শুধু একারণে না যে আমাদের অস্ত্রের জোর আছে। আসলে দুনিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সমীহ করে একারণে যে, যুক্তরাষ্ট্র মুক্তমনে পৃথিবীর প্রতিটি বিশ্বাসকে মূল্যায়ন করে আর বহুত্ববাদী সমাজ লালন করে !

আমরা জানি, এই শক্তিও নয়া যুক্তফ্রন্টের হাতে নেই। যারা নিজেরা কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না, কাউকে মূল্যায়ন করতে পারেন না, তাদের হাতে এমন কোনো আবে হায়াতের পানি নেই যে,তারা হঠাত করে রাজনীতিতে সঞ্জীবনী সুধার নহর বইবে দিবেন !

শেষ করবো ফ্রাঙ্কলিক ডি রুজবেল্টের একটি কথা স্মরণ করে। তিনি বলেছিলেন, রাজনীতিতে কোনো অঘটনই বেহুদা বেহুদা ঘটেনা। যদি কোনো কিছু ঘটেই যায়, তবে খবর রাইখেন, সেভাবে ঘটার জন্যেই প্ল্যানটা করা হয়েছিলো !

অতএব নয়া যুক্তফ্রন্টের হম্বতম্বিতে আশা নেই। তবে জনগণের কাছে যারা যেতে পারবে, জনসমুদ্রে যারা ঢেউ তুলতে পারবে, কালের সঙ্কটের বারুদে যারা ঘষা দিতে পারবে, তাদের আশা আছে ! তাদেরই আশা আছে।                      লেখক পরিচিতি- ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট।

আর পড়ুন:   শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ও আমাদের সমাজব্যবস্থা