১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ *

কালক্রমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের ধরন ও সংস্কৃতি পাল্টে গেছে।আদর্শনির্ভরতার বদলে নেতানির্ভর হয়ে গেছে দলগুলোর সকল কার্যক্রম। বিশেষকরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর (অঙ্গ – সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনসহ) সময়মতো সম্মেলন হয় না। সম্মেলন হলেও মাস-বছর গড়ালেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয় না। অনুসরণ করা হয় না দলীয় গঠনতন্ত্র।  শীর্ষনেতাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছার ওপরই সবকিছু নির্ভরশীল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম উত্তর-দক্ষিণ ও মহানগর যুবলীগের সম্মেলনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।  বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ইতিবাচক পরিবর্তনের কারণে সারা দেশের যুবলীগ নেতাকর্মীদের মনে একধরনের বিশ্বাস ও  ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এ যুবসংগঠনটি অন্ধকার সময় অতিক্রম করে এখন আলোর যুগে প্রবেশ করেছে। এ ধরনের প্রত্যাশার মূল কারণ হলো,সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির সুযোগ্য সন্তান শেখ ফজলে শামস্ পরশ এখন যুবলীগের চেয়ারম্যান। সম্মেলনের আগে দলীয় পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে যেভাবে বায়োডাটা (জীবনবৃত্তান্ত)  সংগ্রহ করা হয়েছিল,তাতে নেতাকর্মীদের মনে নতুন চিন্তার সঞ্চার হয়েছিল এ ভেবে যে , এবার অন্তত একটি ভালো সম্মেলন তারা উপহার পাবে, সময়মতো  পাবে নতুন যোগ্য নেতৃত্ব। সম্মেলনের দিনই জানতে পারবে সভাপতি-সম্পাদকের নাম। সমঝোতা না হলে কাউন্সিলরদের ভোটে হলেও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে। না, নেতাকর্মীরা ব্যতিক্রমকিছু আশা করলেও- তা পূরণ হয়নি। শেখ মনি ও মৌলভী সৈয়দের সেই ঐতিহ্যবাহী যুবলীগের এ বেহাল দশা দেখে দারুণভাবে সংক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়েছেন চট্টগ্রামের যুবলীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা।

২৮, ২৯ ও ৩০ মে ২০২২ ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা ও জাঁকজমকভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ চট্টগ্রাম দক্ষিণ, উত্তর ও মহানগর শাখার ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন অনুষ্ঠানের তিনমাস গত হলেও কমিটি গঠন না হওয়ায় নেতাকর্মীদের মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। ২৮মে পটিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে দক্ষিণ জেলা যুবলীগ, ২৯ মে হাটহাজারী পার্বতী স্কুল মাঠে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবলীগ ও ৩০মে নগরের দ্য কিং অফ চিটাগংয়ে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘসময় পর সম্মেলন হওয়ায় তারুণ্যের জোয়ার বয়ে যায় বন্দরশহর চট্টগ্রাম ও আশপাশের উপজেলায়। দারুণভাবে উজ্জীবিত হয় যুবলীগের নেতাকর্মীরা। বঙ্গবন্ধু-শেখ হাসিনা ও যুবলীগ নেতাদের ছবিসম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুনে ভিন্নরূপ ধারণ করেছিল সর্বত্র। বিশেষকরে যুবলীগের এ তিন ইউনিটের সম্মেলনে সংগঠনটির চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের বক্ততায় নেতা-কর্মীরা বেশ উদ্বুদ্ধ  ও উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। বক্তাদের কেউ কেউ আবেগে কেঁদেছেন। সম্মেলন তিনটিতে যুবলীগ চেয়ারম্যান  তাঁর বক্তব্যে যা বলেছিলেন তার সারকথা হচ্ছে, “ অতীতে দেখেছি, সাংগঠনিক পদ-পদবী ব্যবহার করে অনেকেই দুর্নীতি করেছে, চাঁদাবাজি করেছে। আমি প্রকাশ্যে কথা দিচ্ছি, আমাদের কাছে পদ পেতে কোনো ধরনের উপঢৌকন বা টাকা দিতে হবে না। কোনো আর্থিক সহায়তা লাগবে না। সুতরাং আমাদের প্রত্যাশা, পদ-পদবী নিয়ে আপনারা টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি করবেন না। একটি শুদ্ধি অভিযানের মধ্য দিয়ে আজকের মানবিক যুবলীগের সৃষ্টি। এ যুবলীগে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কোনো স্থান নেই। যুবলীগের পদ মানে নিজের পকেট ভারী করা নয়। আপনারা যদি যুবলীগ করতে চান,পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, এ সম্মেলন যুবলীগের একটি সোনালী অধ্যায় হয়ে থাকবে।  আজ যুবলীগের সম্মেলনে নেতৃত্বে কে আসবে সেটি বড় কথা নয় বরং আগামী নেতৃত্ব কেমন হবে সেটিই হচ্ছে বড় কথা। এটিই হচ্ছে সবচে’ বড় প্রশ্ন।” যুবলীগ চেয়ারম্যানের এ ধরনের সময়োপযোগী সাহসী বক্তৃতায় আবেগের জোয়ারে ভেসেছিলেন অগণিত যুবলীগ নেতাকর্মী। তবে সম্মেলনকে ঘিরে নেতাকর্মীরা যুবলীগে গুণগত পরিবর্তনের যে আশা মনে-প্রাণে ধারণ করেছিলেন, দিনশেষে তা আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কাউন্সিলারেরা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সভাপতি-সম্পাদক ঘোষণা করার দাবী জানালে যুবলীগ চেয়ারম্যান সমঝোতার জন্যে ১০মিনিট সময় দিলেও সমঝোতা হয়নি। তখন কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকায় গিয়ে যাচাই-বাছাই করে তিন ইউনিটের (উত্তর-দক্ষিণ ও মহানগর) কমিটি ঘোষণা দেবেন বলে অধিবেশন শেষ করে প্রার্থীদের বায়োডাটা নিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন না করেই চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন আর একবুক হতাশা নিয়ে যুবলীগের নেতাকর্মীরা ঘরে ফেরেন। শোনা যাচ্ছে, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা যুবলীগের কমিটি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হতে পারে। তবে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের কমিটি কবে হবে তা অনিশ্চিত।

সম্মেলন অনুষ্ঠানের তিনমাস গত হলেও চট্টগ্রাম উত্তর-দক্ষিণ ও মহানগর যুবলীগের কমিটি গঠনে বিলম্বের কারণ জানতে বাংলাদেশ আওয়ামী য়ুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস্ পরশ এর সাথে মুঠোফোনে বারংবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ হয়নি। তাঁর ওয়াটসঅ্যাপেও ম্যাসেজ পাঠানো হয় কিন্তু ব্যস্ততার কারণে হয়তো তিনি সাড়া দিতে পারেননি। একই বিষয়ে জানতে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খাঁন নিখিল এর মুঠোফোনে কয়েকদফা কল করা হলেও অচেনা নম্বর দেখে হয়তো তিনি কল রিসিভ করেননি।যুবলীগের কমিটি গঠন না হওয়ার কারণ সম্পর্কে মুঠোফোনে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি মহিউদ্দিন বাচ্চু এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি। একই প্রশ্ন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক, হাটহাজারী উপজেলা চেয়ারম্যান রাশেদুল আলমকে করা হলে তিনি চাটগাঁর বাণীকে বলেন, “সভাপতি-সম্পাদকপ্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের বায়োডাটা যাচাই-বাছাই করে গুণগত নেতৃত্ব নির্বাচনে হয়তো একটু সময় লাগছে। তবে যুবলীগের সম্মানিত চেয়ারম্যানের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা বিশ্বাস আছে।” কমিটি গঠনে দেরির কারণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী যুবলীগের সদ্য বিদায়ী সভাপতি, সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুন মুঠোফোনে চাটগাঁর বাণীকে বলেন, “দেরির কারণ  আমি বলতে পারছি না। সম্মেলন  অত্যন্ত সুন্দর ও সফলভাবে  সম্পন্ন করে দিয়েছি। কমিটি গঠনের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের।” যুবলীগের কমিটি গঠন করতে এত দেরির কারণ ব্যাখ্যা করতে যেয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী যুবলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি আ ম ম টিপু সুলতান চাটগাঁর বাণীকে মুঠোফোনে বলেন, “আগামীদিনের রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম মোকাবেলা করতে হলে সাহসী ও গতিশীল নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। তাই, যোগ্য নেতা নির্বাচন করতে সময় লাগছে। তবে আশা করি,সহসাই কমিটি ঘোষণা করা হবে “

উল্লেখ্য, স্বাধীন দেশের প্রথম যুবসংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ ১৯৭২ সালের ১১নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুব অঙ্গসংগঠন যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনি। স্বাধীনতার পরেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের যুবসমাজকে একই ফ্লাটফরমে এনে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্যে আত্মনিয়োগ করতে বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিববাহিনীর প্রধান শেখ ফজলুল হক মনিকে যুবলীগ গঠন করার দায়িত্ব দেন। একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধাদের নিয়ে এই যুবলীগ গঠিত হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে ও জাতির ক্রান্তিকালে যুবলীগ সবসময়ই বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার যুবলীগ নেতাকর্মী মৃত্যূ, পঙ্গত্ববরণ ও কারাভোগ করেছেন। এক-এগারোর সময় শেখ হাসিনার মুক্তি আন্দোলনে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করে নানক-আজমের নেতৃত্বাধীন যুবলীগ। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের সময় জীবনঝুঁকি নিয়ে সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এ যুবলীগ।

লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম