৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ২৩শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করোনার কারণে গত দুই বছর বন্ধ ছিল । ১৯৭১ সালের পর থেকে কেবল গত দুই বছরই বন্ধ ছিল পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলের অনুষ্ঠান। তাই এবার রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের উৎসবে এসে আনন্দিত সাধারণ মানুষ।

বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) সকালে রমনা বটমূলে আসা মানুষের মাঝে খুশির আমেজ দেখা যায়।

রমনা বটমূলে সকাল সোয়া ৬টায় নববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর সম্মিলিত কণ্ঠে ছায়ানটের শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীত ‘মন, জাগ মঙ্গললোকে’ গানের মধ্য দিয়ে এবারের আয়োজন শুরু করেন। ছায়ানটের ৮৫ জন শিল্পী এবারের বর্ষবরণ উৎসবে অংশ নেন। এ সময় একে একে মঞ্চের সামনে প্রবেশ করে মানুষ। বটমূলের সামনে এসে উপস্থিত হন দর্শক শ্রোতারা।

রমনায় অনুষ্ঠান দেখতে আসা রাজধানীর ইস্কাটনের বাসিন্দা ইসরাত জাহান বলেন, করোনা ও অনেক দিন পর এবারের পহেলা বৈশাখের আয়োজন হচ্ছে। তাই ভেবেছিলাম মানুষ কম হবে। কিন্তু এখানে এসে দেখছি অনেক মানুষ এসেছে। পান্তা ইলিশ না থাকলেও দীর্ঘদিন পর এমন আয়োজন হচ্ছে, তাতেই ভালো লাগছে।

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ধানমন্ডি থেকে আসা রামচন্দ্র দাস বলেন, করোনার কারণে গত দুই বছর মানুষ ভালোভাবে কোনো উৎসব পালন করতে পারেনি। দীর্ঘদিন পর এবার জাতীয়ভাবে এমন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অন্যান্য বছর অনেক মানুষ হয়ে থাকে নববর্ষের এই অনুষ্ঠানে। রোজা রাখার কারণে অনেকে হয়তো আসতে পারেননি।

তিনি বলেন, নববর্ষের অনুষ্ঠানে অনেক ধরনের অনুষঙ্গ থাকে। পান্তা-ইলিশ তার একটি। এবার এটি না থাকলেও বাকি সবই আছে। নানা রঙের পোশাক পরে মানুষের উপস্থিতি বেশ ভালো লাগছে।

বাবা-মায়ের সঙ্গে রমনা বটমূলে নববর্ষের অনুষ্ঠান দেখতে আসা ছায়ানটের শিশুশিল্পী পূর্বিতা পাবনী জানায়, নিজেদের অনুষ্ঠান দেখতে আসছি। আমাদের বড় আপু-ভাইয়ারা এখানে অংশ নিয়েছে। আমি আনন্দিত ও ভালো লাগছে অনুষ্ঠান দেখে। অনেক মানুষ এসেছে।

প্রাণের উচ্ছ্বাসে শুরু মঙ্গল শোভাযাত্রা

প্রাণের উচ্ছাসে শুরু হয়েছে ১৪২৯ সনের বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা। বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৯টায় টিএসসির রাজু ভাস্কর্য প্রাঙ্গণ থেকে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে শোভাযাত্রাটি বের হয়। স্মৃতি চিরন্তন হয়ে পুনরায় টিএসসিতে গিয়ে শেষ হয় এবারের শোভাযাত্রা।

করোনার কারণে গত দুই বছর বন্ধ থাকার পর এবার এই চিরন্তন শোভাযাত্রা সশরীরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শোভাযাত্রায় আবহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রতীকী উপস্থাপনের নানা বিষয় স্থান পেয়েছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ।

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ বা বাংলা বর্ষবরণ, যা এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও সর্বজনীন এক উৎসবে পরিণত হয়েছে। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ১৪২৯ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখের আনন্দে গোটা দেশ। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই এ দিনটির অপেক্ষায় থাকে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আয়োজিত বাংলা নববর্ষ১৪২৯ বরণ অনুষ্ঠান ও মঙ্গল শোভাযাত্রা

এদিনের অন্যতম আকর্ষণ বর্ণিল সাজ আর আয়োজনের মঙ্গল শোভাযাত্রা। মহামারি করোনার কারণে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ১৪২৭ বঙ্গাব্দে অনুষ্ঠিত হয়নি মঙ্গল শোভাযাত্রা। আর ১৪২৮ বঙ্গাব্দে আয়োজন করে সীমিত পরিসরে। এবার করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। তাই সব পিছুটান দূরে সরিয়ে রাজপথে ফিরছে বিশ্ব সংস্কৃতির চিরচেনা ঐতিহ্য। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে’।

শোভাযাত্রায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মোতায়েন করা হয়েছে ব্যাপক সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। কঠোর নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো রয়েছে পুরো এলাকা।

যেভাবে এলো পহেলা বৈশাখ

এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। পরে কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে বাংলা সন গণনার শুরু হয়। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌর সনের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয় নতুন এই বাংলা সন।

অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তারা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।

মূলত ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের।

ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে। এসময় ঢাকায় নাগরিক পর্যায়ে ছায়ানটের উদ্যোগে সীমিত আকারে বর্ষবরণ শুরু হয়। আমাদের মহান স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এই উৎসব নাগরিক জীবনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে।

কালক্রমে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এখন শুধু আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী ধারক-বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।