১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার ঘটনায় জড়িত খুনি ও খুনিদের সহযোগীরা পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিল। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তারা বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ মিশনে উচ্চ পদে নিয়োগ পায়।
এদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তীতে রাষ্ট্রদূত পদেও পদোন্নতি লাভ করে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খুনিরা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। তবে সেসময় যুক্তরাষ্ট্র সরকার খুনিদের আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি। পরে বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রায় তিন মাস পর ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর ব্যাংককে আশ্রয় নেয় খুনিরা। সেখান থেকে খুনিরা আশ্রয় নেয় লিবিয়ায়।
১৯৭৬ সালের ৮ জুন বঙ্গবন্ধু হত্যায় অভিযুক্তরা তৎকালীন সরকারের সহযোগিতায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে নিয়োগ পায়। বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি শরিফুল হক ডালিম প্রথমে বাংলাদেশের বেইজিং দূতাবাসে প্রথম সচিব পদে নিয়োগ পায়। সেখান থেকে তিনি ১৯৮২ সালে হংকংয়ের বাংলাদেশ মিশনে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে নিয়োগ পায়। ১৯৮৮ সালে তিনি কেনিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পায়। সেসঙ্গে তিনি তানজানিয়ার অনাবাসী দূত হিসেবে দায়িত্বও পালন করে।
বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরী ইরানে দ্বিতীয় সচিব পদে নিয়োগ পায়। এরপর তিনি আলজেরিয়া ও ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি করেন। ১৯৯৪-৯৬ সালে তিনি হংকংয়ে বাংলাদেশ মিশনের কনসাল জেনারেল ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় আশ্রয় নেয়। এখনো তিনি কানাডায় অবস্থান করছেন।

বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি মেজর রাশেদ চৌধুরীকে ১৯৭৬ সালে সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর কেনিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি করেন তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে দেশে ফিরতে নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি দেশে না ফিরে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যায়। এখনো তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।
বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি আজিজ পাশা আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োগ পায়। খুনি আজিজ পাশা ২০০১ সালের জুন মাসে জিম্বাবুয়েতে পলাতক অবস্থায় মারা যায়। তবে তার মৃত্যুর বিষয়ে প্রকৃত তথ্য এখনও অজানা রয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর খুনি ও খুনিদের সহযোগীদের মধ্যে আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োগ পায় মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ। মেজর বজলুল হুদা পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পায়। কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব পদে নিয়োগ পায় শরিফুল হোসেন। ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেম আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব পদে নিয়োগ পায়। কানাডায় তৃতীয় সচিব পদে নিয়োগ পায় নাজমুল হোসেন। আর আবদুল মাজেদ তৃতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পায় সেনেগালে। মেজর শাহরিয়ার রশিদ নিয়োগ পায় ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব পদে। আর মিশরে তৃতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পায় এম খায়রুজ্জামান।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বদানকারী লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশীদ দূতাবাসের চাকরিতে যোগ দিতে রাজি হয়নি। তারা দু’জন লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির আশ্রয়ে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেন।
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিষয়ে সাবেক কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, তারা (বঙ্গবন্ধুর খুনিরা) পেশাদার কূটনীতিকদের নানাভাবে অপদস্থ করতো। তারা খুব দাপট নিয়ে চলতো। কেননা সেসময় তাদের সঙ্গে তৎকালীন সরকার প্রধানদেরও খুব ভালো যোগাযোগ ছিল।
প্রসঙ্গত, উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ১২ খুনির মধ্যে পাঁচ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এই পাঁচজন হলো সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমদ, এ কে বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল খুনি এম এ মাজেদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অপর পাঁচ আসামির মধ্যে বিদেশে পালিয়ে রয়েছেন খন্দকার আবদুর রশিদ, এম রাশেদ চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন খান। পালিয়ে থাকা খুনিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এম রাশেদ চৌধুরী। আর কানাডায় অবস্থান করছে খুনি নূর চৌধুরী।