১৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ৩০শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ*

সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ গত ১৪জুলাই সকালে পরলোকগমন করেন।নানান নাটকীযতায়ভরা এক রাজনৈতিক জীবনের চিরঅবসান ঘটলো।রাজধানীর সামরিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করার কথা থাকলেও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে ১৬জুলাই রংপুর জেলা শহরে এরশাদের বাড়ি পল্লীনিবাসের লিচুবাগানে বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন।

এরশাদের দুঃশাসনের (১৯৮২-৯০) একজন রাজনৈতিক স্বাক্ষী হিসেবে কিছু লেখার উদগ্র বাসনা মনে জেগে ওঠলো।তাঁর দুঃশাসনের সময়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার অনেক দুঃসহ স্মৃতি রয়েছে।১৯৮২ সালের ২৪মার্চ এরশাদ সামরিক আইন জারি করলে সীতাকুণ্ড কলেজের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের প্রচারণা বন্ধ হয়ে যায়।ওই নির্বাচনে জাতীয় ছাত্রলীগের মহিউদ্দিন আহমেদ মঞ্জু ও আবু তাহের(মহিউদ্দিন-তাহের)প্যানেলে আমি এজিএস প্রার্থী ছিলাম।নির্বাচনের কিছুদিন আগেই সামরিক আইন জারি হওয়ায় দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত সেই নির্বাচন আর হয়নি।প্রচার-প্রচারণার শেষপর্যায়ে এসে যদি নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়- তা প্রার্থীদের জন্যে যে কেমন মানসিক যাতনার তা সহজে অনুমেয়।এছাড়া স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন করতে যেয়ে আমাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।বিশেষকরে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হাতে বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছিলাম।চট্টগ্রামের লালদিঘির মাঠে শেখ হাসিনার জনসভায় এরশাদের পুলিশ বাহিনীর ভয়াবহ তাণ্ডবলীলাসহ রাজপথের বহু ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এ সামরিক শাসককে নিয়ে কিছু না লিখলে যেন অপূর্ণ থেকে যায়।

বিশ্বইতিহাসে এরশাদই সেনাছাউনী থেকে আসা একমাত্র স্বৈরশাসক যিনি গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েও আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছিলেন।দেশছেড়ে পালানোর বদলে জেলে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৫টি আসনে জয়ী হয়ে বিষ্ময়কর ইতিহাস তৈরি করেছেন।যে আওয়ামী লীগ–বিএনপিসহ তিনজোটের নেতৃত্বে দেশের প্রায় সকল বিরোধীদল এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৮/৯বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিল পরবর্তীতে সে-ই দু’দলই ক্ষমতায় যেতে এরশাদকে কাছে টানায় সক্রিয় ছিল।আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিরোধকে কাজে লাগিয়ে তিনি রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছেন।রাজনীতির মাঠে তিনি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে বরাবরই গোল দিয়ে গেছেন, ছক্কা হেঁকেছেন।জাতীয় নির্বাচন, সরকার গঠনসহ সকল ক্ষেত্রে এরশাদ নিয়ামক রাজনৈতিক শক্তিতে পারিণত হন।এরশাদ তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিসমায় স্বৈরাচার শব্দটিকে এমনএক মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, ৬ডিসেম্বর রাজনীতির মাঠে ‘স্বৈরাচার পতন দিবস’ হিসেবে কখনো ঘটা করা পালন করতে দেখা যায়নি।এরশাদ যে স্বৈরাচার ছিলেন- তা এ দেশের জনগণ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।আমাদের অসুস্থ রাজনীতিই এ জন্যে দায়ী।মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে যান।রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এমনএক পর্যায়ে গড়িয়েছে যে, নীতি-নৈতিকতাহীন রাজনৈতিক চরিত্রের অধিকারী এরশাদের প্রয়োজনীয়তা আমৃত্যু অক্ষুণ্ন ছিল।এটি জাতির জন্যে লজ্জার হলেও এরশাদের জন্যে ছিল কৃতিত্বের। আমৃত্যু তিনি ছিলেন ক্ষমতার বলয়ে।তাঁর কৃতকর্মের জন্যে যে বিচার ও শাস্তি হওয়ার কথা ছিল- তা হয়নি।

রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে এরশাদ তাঁর স্বৈরাচার বদনাম ঘোচাতে অনেক গণমুখি কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন।দেশের সার্বিক উন্নয়নে অনেক উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।মহাকুমাকে জেলায় উন্নীত করে দেশকে ১৯জেলার স্থলে ৬৪জেলায় বিভক্ত করেন।সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের সহানুভূতি কুড়াতে তিনি ইসলামকে রাষ্টধর্ম, টিভিতে আজান প্রচার, মসজিদ-মাদ্রাসার বিদ্যুতবিল মওকুফ ও রবিবারের বদলে শুক্রবারকে ছুটির দিন করেন। তাঁর আরও একটি উল্লেখযোগ্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা জনগণের দোড়গোড়ায় আনতে উপজেলা পদ্ধতির প্রবর্তন  করা।তিনি প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার একনিষ্ঠ প্রচারক ও সমর্থক ছিলেন।দেশের ৭টি বিভাগকে নিয়ে প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন। তিনি Dacca এর নাম Dhaka করেছিলেন।এরশাদ ‘পল্লীবন্ধু’ হিসেবে খ্যাতিলাভ করেন। কবিতাও লিখতেন তিনি। দেশ-বিদেশের কবিসাহিত্যিকদের সমাদর করতেন। দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের নেতৃত্বে কবিতা পরিষদও গঠন করেছিলেন।

১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ যখন বিএনপির সাত্তার সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রীয়ক্ষমতা দখল করেন তখন বিরোধীরা বেশ খুশি হয়েছিলেন।বিএনপি নেতাদের একটি বড়অংশ এরশাদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন।১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রতিক নিয়ে অংশ নিয়েছিল।আওয়ামী লীগ, সিপিবি, ন্যাপ (মোজাফ্ফর), জাসদ (রব) নির্বাচনে অংশ নেয়ায় এরশাদ ও জামায়াত ইসলামী রাজনৈতিক বৈধতা পেয়ে যায়।এ ঘটনা এরশাদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আত্মাহুতি দেয়া সেলিম, দেলওয়ার, মোজাম্মেল,দিপালী সাহা, রাউফুন বসুনিয়া, নুর হোসেন, ডা. মিলন, মহিউদ্দিন শামীমসহ অগণিত শহীদদের আত্মার প্রতি অসম্মান ও অবমাননার শামিল।

১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠন করার মতো অবস্থা ছিল না। বিএনপি এরশাদকে পাঁচবছর জেলে রেখেও তাঁর সঙ্গে আঁতাত করে আওয়ামী লীগকে বিরোধীদলে রাখার তৎপরতা চালিয়েছিল।এরশাদকে প্যারোলে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব এসেছিল।প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এতে বাধা দিয়েছিলেন।তখন থেকে এরশাদকে নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র রশি টানিটানি শুরু।এ দু’দলের কাছে এরশাদ নিজের গুরুত্বের কথা উপলব্ধি করে নির্বাচন এলেই নিজেকে নিলামে ছড়াতেন, দরদামও হাঁকতেন সুবিধামতো।

এরশাদ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে অনেক রাজনৈতিক অপকর্মও কম করেননি।ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তোলে দিয়ে ছাত্ররাজনীতির বারোটা বাজিয়েছেন।সন্ত্রাসের জনপদে রূপান্তরিত হয়েছিল পুরোদেশ।তাঁর শাসনের পুরোটা সময় ছিল উত্তাল।রক্ত ঝরেছে রাজপথে, ট্রাক ওঠেছে মিছিলের ওপর,বহু মায়ের বুক খালি হয়েছে।ক্ষমতার স্বার্থে তিনি সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে শিকড় গাড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘাতক কর্নেল ফারুককে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।এছাড়া নজিরবিহীন নারীপ্রীতির জন্যে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন এরশাদ। ভোল পাল্টানোর ক্ষেত্রে রাজনীতিতে তাঁর জুড়ি কেউ আছে বলে মনে হয় না।।বহুরূপী চরিত্রের কারণে শিল্পী কামরুল আহসান তাঁকে ‘বিশ্ববেহায়া’ হিসেবে চিত্রিত করেন।সবকিছু মিলিয়ে বলতে হয়, সেনাছাউনি থেকে তাঁর উত্থান হলেও রাজনীতিকে তিনি ভালই কূটচাল চালিয়েছেন।বলা যায়, ইহজগত থেকে তিনি সসম্মানে চিরবিদায় নিয়েছেন।

লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম