১৯শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ৩রা জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট রবিবার নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ আজ দেশটির রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে।

২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ তিনি দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারি করেন। এতে বলা হয়েছে, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত্ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না’।

ঘাত-প্রতিঘাত আর সংঘাতের সময় রটিয়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধু দুর্নীতি করে বিত্তের পাহাড় গড়েছেন কিন্তু ধর্মের কল বাতাসেই নড়ে। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের ২২ জনের একাউন্টে পাওয়া গেছে মাত্র ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা !

এ হলো খন্দকার মোশতাক! বঙ্গবন্ধুর ক্যাবিনেটের বাণিজ্যমন্ত্রী। পনের আগস্টের নারকীয়তার মাত্র কিছু দিন আগের পত্রিকায় দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু ওজু করতেছেন আর মোশতাক বদনায় করে বঙ্গবন্ধুর পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছেন।

আরো আছে। মুজিব জননী বেগম সাহেরা খাতুন মারা গেছেন। তিনি যাচ্ছেন টুংগি পাড়ায় মাকে দেখার জন্য। শেষ দেখা। সঙ্গে জুটলেন দুই মন্ত্রি;-খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও তাহের উদ্দিন ঠাকুর। বঙ্গবন্ধু তাঁর মায়ের জন্য যত কাঁদলেন না তারথেকে বেশি কাঁদলেন মোশতাক। সেই দৃশ্য দেখে মানুষের ভুল হওয়া স্বাভাবিক, মোশতাকের কেউ সম্ভবত মারা গেছেন। কারণ সেকি যেমন তেমন কান্না ! সারা পথ নিজেই কাঁদলেন।

বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে মোশতাক ছিলেন তাঁর একেবারে ছায়া সহচর। তার মনে যাই থাকুক, নেতার সামনে তিনি থাকতেন বান্দা হাজির মনোভাব নিয়ে। মন ভেজানো কথা বলতেন।

মোশতাকের রাজনৈতিক চরিত্রে স্থিরতা বলে কিছু ছিলো না। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নোমিনেশন না পেয়ে প্রথম হক-ভাসানীর নেতৃত্বের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। আওয়ামী লীগকে যখন অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান রূপে পুনর্গঠন করার জন্য মুজিব-ভাসানী একযোগে কাজ করছেন, তখন তিনি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। আইন পরিষদে সরকারি হুইপ হবার লোভে আবার তিনি আওয়ামী পার্লামেন্টারি পার্টির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন এবং কৃষক শ্রমিক পার্টির সরকারে গিয়ে ঢোকেন।

মোশতাকের সব থেকে বড় বিশ্বাস ঘাতকতা ১৯৭১ এ। তিনি মুজিবনগরে বসে মাহবুব আলম চাষী, তাহের উদ্দিন ঠাকুর প্রমুখকে সঙ্গে নিয়ে একটি চক্র তৈরি করেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযুদ্ধ বানচাল করে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন গঠন করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।

১৯৭১-এ আমেরিকা একদিকে অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানিদের সাহায্য করেছে অন্যদিকে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য পাঠাচ্ছে নানা রকম ত্রাণসামগ্রী! কলকাতার সার্কাস এভিনিউতে ছিল মোশতাকের অফিস। মুক্তিযুদ্ধ যখন পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে চলেছে মোশতাক তখন মার্কিনি পরামর্শে যুদ্ধ থামিয়ে আলোচনা করার জন্য জোর প্রচার চালাচ্ছিলেন, সেই সাথে অস্থায়ী সরকারকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র।

একটি প্রচারপত্র বিলি ছিল এই রকম; ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স অর মুজিব?’ মুজিব না স্বাধীনতা? এই প্রচারপত্রটির মূল বক্তব্য ছিল, আমরা যদি পাকিস্তানের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধ করি তাহলে পাকিস্তানিরা কারাগারে মুজিবকে হত্যা করবে। শেখ মুজিব ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে। সুতরাং স্বাধীনতার আগে মুজিবের মুক্তি দরকার এবং মুক্তির পর পাকিস্তানের সাথে আলোচনা দরকার।

এই প্রচারত্রের মাধ্যমে মোশতাক এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিলেন। তারা প্রচার করছিল যে তাজউদ্দিন চাইছেন না মুজিবের মুক্তি হোক। তিনি চান মুজিবকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপ্রধান হতে। এই প্রচার পত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।

মোশতাক ঐ সময় বিদেশেও যুদ্ধবিরোধী প্রচারণা চালায়। বিভিন্ন পত্রিকায় বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর মোশতাক গ্রুপের বিচার হওয়ার কথা ছিল কিন্তু তাজউদ্দীন আর বঙ্গবন্ধু তাকে ক্ষমা করে দেন।

বঙ্গবন্ধুর মায়ের মৃত্যুতে যিনি কেঁদে চোখ ফুলিয়েছিলেন, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই মুজিবের এবং তাঁর স্ত্রী-পুত্র পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে উল্লাস প্রকাশ করে হত্যাকারীদের খেতাব দিলেন ‘সূর্য সন্তান’ বলে এবং এই বর্বরতা কে আখ্যা দিলেন ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা বলে।

পাকিস্তানিদের দিয়ে মোশতাক প্রচার করায় তাজুদ্দিন আসলে ভারতীয় ব্রাহ্মন। মুসলমান নাম গ্রহণ করে তিনি আওয়ামী লীগে ঢুকেছেন পূর্বপাকিস্তানে ভারতীয় ষড়যন্ত্র সফল করার জন্য। ১৯৭৫ সালে তাজউদ্দিনসহ চার জাতীয় নেতাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে জেলে হত্যা করান। রটানো হল-তিনি জেলে বসে ভারতীয় কমিশনারকে গোপনে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী আনার জন্যে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এতকিছু জানার পরেও বঙ্গবন্ধু কেন তাকে ক্ষমা করেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশাল হৃদয়ের মানুষ। এ নেতার জীবনে ক্ষমার দৃষ্টান্ত ভুরিভুরি। মাহমুদ আলী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধীতা করে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার সাথে হাত মিলান। ১৯৭১ এ যখন বাংলাদেশে বর্বর গণহত্যা চলছে, তখন পাকিস্তানের সব চাইতে বড় দোসর ছিলেন মাহমুদ আলী। তার মেয়ে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে অশালীন ভাষায় স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুজিববিরোধী প্রচারণা চালায়।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মাহমুদ আলী দেশ ছেড়ে পালালেন। প্রথমে লন্ডন, পরে নিউইয়র্ক, তারপর পাকিস্তানে। কিন্তু তার স্ত্রী-পুত্র তখনও ঢাকায়। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে, ক্রোধান্ধ জনতার হাতে তারা লাঞ্ছিত হবে অথবা তার কন্যাকে কোলাবরেটর হিসেবে জেলে পাঠানো হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে কিছুই হতে দিলেননা । পুলিশকে আদেশ দিলেন মাহমুদ আলীর পরিবারের কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। বিশ হাজার টাকা ও পাসপোর্ট দিলেন তাদের নিরাপদে দেশত্যাগ করার জন্য। তারপর সকলের অগোচরে পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তায় তাদের বাংলাদেশ ত্যাগ করার ব্যবস্থা করলেন। এটা যখন জানাজানি হল তখন আওয়ামী লীগের নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধারা অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। বঙ্গবন্ধু তাদের শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘মাহমুদ আলীকে হাতে পেলে বিচার করতাম কিন্তু তার ছেলেমেয়ে বা স্ত্রীর কোনো ক্ষতি হোক তা আমি চাই না’।

পাকিস্তানি দালাল সবুর খানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। এই সবুর খান ঢাকা পতন হবার আগের দিনও রেডিওতে পাকিস্তানের পক্ষে গলাবাজি করেছে। স্বাধীন হবার পর জনতা তাকে হত্যা করার জন্যে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। তিনি থানায় আত্মসমর্পন করেন এবং জেলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে দালাল আইনে তার বিচার শুরু হলে জেলে থাকাকালীন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু সবুর খানের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

আজকে যারা তাঁর মৃত্যু নিয়ে উপহাস করে তাদের বুঝতে হবে ইতিহাস সত্যের ক্ষেত্রে বড়ো নির্মম। এখানে নষ্টামি করার কোন স্থান নেই। ইতিহাসের আস্তাকুড় বড়ো খারাপ জায়গা। একবার মীর জাফর কিংবা ঘসেটি বেগম নাম ওঠে গেলে অনন্তকাল সে খেতাব নিয়েই থাকতে হবে। আজকে সিন্ধু, বেলুচিস্তান কিংবা পাখতুনদের যে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি বঙ্গবন্ধু না থাকলে আমাদের আজো জ্বলতে হতো পাকিস্তানি জ্বালামুখে।

গোলাম সারোয়ার- গবেষক ও কলামিস্ট।