১৫ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ২৯শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ *

কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে টেকসইভাবে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সারাদেশের মতো পার্বত্য এলাকাসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সমৃদ্ধি কর্মসূচিসহ দেশব্যাপী আর্থিক ও অ-আর্থিক সেবাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। পিকেএসএফ এর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক-১ মো. ফজলুল কাদের ১৯-২২ জুন চট্টগ্রামের সহযোগী সংস্থা  বিএএসএ ফাউন্ডেশন, আইডিএফ, ইপসা ও কোস্ট ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শনে আসছেন।

ফজলুল কাদের ১৯ জুন বিকেলে বিমানযোগে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবেন এবং আইডিএফ এর চান্দগাঁও গেস্টহাউজে রাতযাপন করবেন। ২০ জুন সকাল ৭টায় সড়ক পথে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবেন এবং রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বিএএসএ ফাউন্ডেশন কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘টেকসই মৌচাষ উন্নয়ন এবং মৌপণ্য বিপণনের মাধ্যমে মৌচাষিদের আয় বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক ভ্যালু চেইন উন্নয়ন প্রকল্প এর অংশীজনদের সাথে বৈঠক করবেন। রাঙ্গামাটি থেকে পিকেএসএফ এএমডি ফজলুল কাদের একইদিন বেলা আড়াইটায় সহযোগী সংস্থা ইপসা’র সীতাকুণ্ডের মানবসম্পদ উন্নয়নকেন্দ্রে যাবেন এবং সেখানে রাতযাপন করবেন।২১জুন  সকালে ইপসা’র ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্প পরিদর্শন শেষে বিকেলে চট্টগ্রাম শহরের পিডিএফ এর অতিথিশালায় অবস্থান করবেন।২২জুন সকালে বান্দরবানের লামায় পিডিএফ এর নৃতাত্তিক গোষ্ঠীর  ক্ষুদ্র উদ্যোগ উন্নয়ন প্রকল্প ও বিকেলে  কক্সবাজারে কোস্ট ফাউন্ডেশনের ক্র্যাব হ্যাচারি প্রকল্প পরিদর্শন শেষে ফজলুল কাদের বেলা ৫টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম ত্যাগ করবেন।

মধু ও মৌপণ্য উৎপাদন প্রকল্প

আধুনিক ও বৈজ্ঞানিকপদ্ধতিতে মধু এবং মৌপণ্য উৎপাদন, উন্নত প্রযুক্তি আহরণ ও প্রয়োগএবং মৌপণ্য বাজারজাতকরণের মাধ্যমে মৌচাষী ও মৌফসল উৎপাদনকারীদেরআয়বৃদ্ধিকরণ, কর্মসংস্থনের সুযোগসৃষ্টির    মাধ্যমে জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে পিকেএসএফ দেশের ৭টি জেলার ২৪টি উপজেলায় বিএএসএ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায়“টেকসই মৌচাষ উন্নয়ন এবং মৌপণ্য বিপণনের মাধ্যমে মৌচাষীদের আয় বৃদ্ধিকরণ” শীর্ষক ভ্যালু চেইন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

খাগড়াছড়ির খাগড়াছড়ি সদর, গুইমারা, দিঘীনালা, পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা ও মহালছড়ি উপজেলা,বান্দরবানের বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি ও আলীকদম উপজেলা, রাঙামাটির রাঙ্গামাটি সদর, বাঘাইছড়ি ও কাউখালী উপজেলা, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, সখীপুর, গোপালপুর, ভূয়াপুর, ঘাটাইল, মধুপুর উপজেলা,  সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলা গাজীপুরের গাজীপুর সদর, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া উপজেলা এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় মধু ও মৌপণ্য উৎপাদন প্রকল্পের কাজ চলছে।

আধুনিক ও বৈজ্ঞানিকপদ্ধতিতে মধু এবং মৌপণ্য উৎপাদন, উন্নত প্রযুক্তি আহরণ ও প্রয়োগ এবং মৌপণ্য বাজারজাত করণের মাধ্যমে মৌচাষী ও মৌফসল উৎপাদন কারীদের আয়বৃদ্ধিকরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে জীবন যাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে এ প্রকল্পগ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি গ্রহণের উদ্দেশ্য হচ্ছে,মধু এবং মৌপণ্য উৎপাদন ও সংগ্রহে বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়ন করার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা। মধু এবং মৌপণ্যের উপকারী দিক/ গুণাগুণ সম্পর্কে ভোক্তাসাধারণের সচেতনতাবৃদ্ধি করা তথা মধু এবং মৌপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিতে অবদান রাখা ও বিশুদ্ধ মধু সরবরাহ বৃদ্ধি ও বাজারজাতকরণে  র মাধ্যমে মধুর বিক্রয় বৃদ্ধি করা।

সমৃদ্ধি কর্মসূচি

ক্ষুদ্র ঋণ কখনোই দারিদ্র্য বিমোচনের একমাত্র পথ নয়।এরসঙ্গে জীবনমান উন্নয়নসংক্রান্ত আরো কিছু বিষয় জড়িত থাকতে হয়।এই উপলব্ধি থেকেই পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ‘সমৃদ্ধি’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।এ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক লক্ষ্যমাত্রা সরাসরি অর্জিত হচ্ছে।পাশাপাশি অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পরোক্ষভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে।

পিকেএসএফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘সমৃদ্ধি’ ২০১০সাল থেকে বাস্তবায়িত হয়ে আসা এ কর্মসূচির পূর্ণরূপ ‘দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে দরিদ্র পরিবার সমূহের সম্পদ ও সক্ষমতাবৃদ্ধি’।দেশের ৪৩টি ইউনিয়নের দুইলাখ ৪৭হাজার ৩২২টি খানা নিয়ে এইকর্মসূচি শুরু হয়। ১১৬টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে দেশের৬৪টি জেলার ১৬৪টি উপজেলার ২০২টি ইউনিয়নে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এমানব কেন্দ্রিক কর্মসূচি।এ কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী ১২লাখ ৪৭হাজার খানায় ৫৬লাখ ৯২হাজার জনসংখ্যাকে স্বাস্থ্য,শিক্ষা,পুষ্টিসহ মোট ৩০টি বিভিন্ন সেবা দেয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ইয়ং পাওয়ার ইন সোস্যাল অ্যাকশান (ইপসা) সমৃদ্ধি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।এছাড়া ইপসা পিকেএসএফএর সহযোগিতায় সীতাকুণ্ড ও মীরসরাইয়ে ইকোট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।সহজ যোগাযোগ মাধ্যম, প্রাকৃতিক পরিবেশের বৈচিত্র্যতা এবং জনগোষ্ঠীর ভিন্নতা সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইকে দেশি ও বিদেশী পর্যটকের নিকট আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত করেছে। তাই সেখানে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে স্থানীয় কমিউনিটি নির্ভর ইকোট্যুরিজম শিল্পের বিকাশ ঘটানো।স্থানীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবনযাত্রার  মান (ব্যবসায় মুনাফা বৃদ্ধি, আত্মকর্মসংস্থান ও মজুরী শ্রম সৃষ্টি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত) উন্নয়নের লক্ষ্যে ইপসার প্রধান নির্বাহী মো.আরিফুর রহমান সরকারি সহযোগি সংস্থা পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর সহযোগিতায় ‘চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে ইকো-ট্যুরিজম শিল্পের উন্নয়ন’ শীর্ষক ভ্যালু চেইন উন্নয়ন প্রকল্প চালু করেন।

উল্লেখ্য, গণপ্রজাতন্ত্রী  বাংলাদেশ সরকার ১৯৯০সালে পল্লীকর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) প্রতিষ্ঠা করে।এরূপ  প্রকল্প হলো: ‘এমন এক বাংলাদেশ যেখানে দারিদ্র্য উন্মুলিত হবে; বিদ্যমান উন্নয়ন ও সুশাসনের নীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবকেন্দ্রিক ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই এবং সমস্ত নাগরিক সুস্থ, যথাযথভাবে শিক্ষিত, ক্ষমতায়িত এবং মানবিক মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করবে।’

পিকেএসএফ-এর অভিলক্ষ্য হলো: মানবজীবন ও দারিদ্র্যের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকার করে নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন; জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে উপযুক্ত প্রয়োজনসমূহ পূরণ করে, মানুষের প্রগতিতে জীবন চক্রের সমগ্র পদ্ধতির অনুসরণ। নীতি পররিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়নের কেন্দ্রে থাকবে মানুষ এবং এসবের মূল লক্ষ্য থাকবে মানুষের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষা। সহায়তা ও পরিষেবার অন্তর্ভুক্ত থাকবে শিক্ষা, কর্মশক্তি উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, অবকাঠামো, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক সমস্যা এবং সামাজিক মূলধনের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উপযুক্ত অর্থায়ন, জলবায়ুপরিবর্তনের প্রভাবজাত যথাযথ প্রতিক্রিয়া, জেন্ডার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ক্রীড়া এবং সামাজিক সচেতনীকরণ ইত্যাদি।

এ সকল অভিলক্ষ্যের   সমন্বয়ে পিকেএসএফ ‘সমৃদ্ধি’ শীর্ষক একটি যুগান্তকারী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ২০১০সাল থেকে বাস্তবায়নাধীন পিকেএসএফ-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও গণবান্ধব এ কর্মসূচির পূর্ণরূপ হলো ‘দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে দরিদ্র পরিবারসমূহের সম্পদ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি’। সামগ্রিকভাবে, এ কর্মসূচির লক্ষ্য হচ্ছে মানবমর্যাদা এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা।এলক্ষ্য অর্জনে  বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সূচক আমলে নিয়ে দারিদ্র্যের বহুমাত্রিক সমস্যা বিবেচনায় রেখে নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। মূলত, মাতৃগর্ভ হতে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের সকল পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সকল অনুষঙ্গ অন্তর্ভুক্ত করে কমিউনিটি-ভিত্তিক উন্নয়নের ধারণাই হচ্ছে ‘সমৃদ্ধি’। বর্তমানে দেশের ২০২টি ইউনিয়নের প্রায়৬০লাখ মানুষের মাঝে কাজ করছে এ কর্মসূচি।

পিকেএসএফ এএমডি ফজলুল কাদের একজন সৎ, মেধাবী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মঠ কর্মকর্তা।   এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক  পরিমণ্ডলে প্রশংসিত উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান পিকেএসএফ এর সার্বিক কার্যক্রমের বিবরণ দিয়ে চাটগাঁর বাণীকে তিনি বলেন, “ আমাদের দেশ একটি সাব-ট্রপিকেল দেশ। এখানে সবধরনের সাব-ট্রপিকেল ও ট্রপিকেল ফলফলাদি ও মশলার চাষ সম্ভব। এ দেশ হতে পারে বিশ্বের  অন্যতম বৈচিত্র্যিপূর্ণ ফল উৎপাদনকারী দেশ।পিকেএসএফ এ কাঙ্ক্ষিত বৈচিত্রায়নে প্রণোদনা দিয়ে আসছে।তিনি আরও  বলেন, “ প্রতিকূল পরিবেশে জন্ম নেয়া প্রতিভাতে বিনিয়োগ হচ্ছে, বৈষম্য দূরিকরণে ও মানবিক বিকাশে সর্বোত্তম বিনিয়োগ। পিকেএসএফ এর শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচি এ পিছিয়েপড়া পরিবারের মেধাবী সন্তানদের অব্যাহতভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে। এদের অনেকে এখন উচ্চশিক্ষিত হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ও হচ্ছে। এছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ‘ক্ষুদ্র উদ্যোগ উন্নয়ন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে পিকেএসএফ।”

লেখক- প্রধানসম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁরবাণী ও chatganrbani.com