১৫ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ২৯শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ আলী শাহীন *

উন্নত দেশগুলোকে অনুসরণ করে পরিবেশসম্মতভাবে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার দিকে নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ। পরিবেশসম্মত ও নিরাপদ উপায়ে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে আন্তর্জাতিক নীতিমালা হংকং কনভেনশনের আলোকে গ্রিনইয়ার্ড তৈরির মাধ্যমে আধুনিকায়নে নামছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড সমুদ্রোপকূলে গড়ে ওঠা শিপইয়ার্ড মালিকেরা। হংকং কনভেনশন হলো নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করতে আইএমও (ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অরগানাইজেশন) কর্তৃক প্রণীত একটি আন্তর্জাতিক নীতিমালা। বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন ২০১৮ প্রণয়ন করেছে এবং এ আইন প্রতিপালনে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে।

আধুনিকায়নে সচেষ্ট হওয়া সত্ত্বেও এখনো সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোতেপরিবেশ দূষণ ও শ্রমিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে। আর বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গ্রিনইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশে এ সংখ্যামাত্র ১টি। তবে জাহাজভাঙা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের একটি বড় সমস্যা হলো এ শিল্পের অধিকাংশ কারখানায় দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের প্রাণহানী। যার কারণে এ শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া এশিল্পে গত ১৫ বছরে দুর্ঘটনায় ২২৫ জনের অধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গত বছরে ১৪জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। বছরওয়ারি শ্রমিকদের প্রাণহানির সংখ্যা-ই এশিল্পের ঝুঁকির পরিমাণ নির্দেশ করে দেয়।  অন্যদিকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শিপইয়ার্ডে পরিবেশআইন ভঙ্গ ও অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ভাঙার জন্যে আমদানিকৃত পুরোনো জাহাজগুলোর বিচ্ছিন্নকরণ একটি জটিল প্রক্রিয়া, তাই বৈজ্ঞানিকউপায়েজাহাজভাঙা সম্পন্ন হওয়া উচিত।

তবে আশার কথা হলো, কয়েকজন মালিক এ শিল্পের ভাবমূর্তি পরির্বতনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা শুরু করেছেন এবং একটি ইয়ার্ড ইতোমধ্যে গ্রিনইর্য়াড হিসেবে আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং হংকং কনভেনশন কমপ্লায়েন্সের জন্যে একটি স্ট্যান্ডার্ড ক্লাসিফিকেশন সোসাইটির সনদ (সার্টিফিকেট অবকমপ্লায়েন্স) লাভ করেছে এবং অন্য আরো কয়েকটি শিপইর্য়াড মালিক সেই পথ অনুসরণ করছেন বলে আমরা মালিক কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারি।

জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে শিল্পের সার্বিক উন্নয়ন, শ্রমনিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে নিম্মোক্ত কিছু মতামত বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের সম্ভাবনাময়ী এশিল্পের পরিবেশগত উন্নয়নে প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব, যথাযথ দিকনির্দেশনা এবং জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায় থেকে কার্যকরী কারিগরি সহযোগিতা। সেইলক্ষে হংকং কনভেনশন এবং দেশীয় সকল আইনের আলোকে এশিল্পের উন্নয়নে সরকারের পক্ষ হতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে। শিপইয়ার্ডভিত্তিককার্যকরী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিনিয়ত পরিদর্শন এবং তদারকি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন ২০১৮-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো SRFP – Ship Recycling Facility Plan (শিপইয়ার্ডভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা) যেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না কিংবা সাগরে কোনো রকমের বর্জ্য বিশেষ করে কালো তেল বা অন্যান্য  বিষাক্ত তরলবর্জ্য নিক্ষিপ্ত হচ্ছে কিনা- তা মনিটরিংয়ের জন্যে দক্ষ পরিদর্শক দল গঠন করা যেতে পারে। এ শিল্পের সার্বিক কাজের সমন্বয়ে সরকার চট্টগ্রামে One Stop Service নামে একটি কেন্দ্র চালু করতে পারে। এতে জাহাজ আমদানির অনুমতিসহ সকল বিষয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম দ্রুত সুরাহা করা অনেক সহজতর হবে। এ কেন্দ্রের মাধ্যমে জাহাজশিল্পে যেকোনো ধরনের লঙ্গন বা অঘটনের জন্যে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। আর পরিবেশ সুরক্ষায় বা সেলকনভেনশন (বর্জ্যের বৈশ্বিক স্থানান্তর নিয়ন্ত্রণজনিত সনদ) এবং হংকং কনভেনশনের কমপ্লায়েন্স মেনে এবং উত্তমমানের ক্লাসিফিকেশন এজেন্সি কর্তৃক জাহাজের ক্ষতিকারক বর্জ্য(আইএইচএম-ইনভেন্টরি অব হেজার ডেজওয়েস্ট) তালিকা প্রণয়ন করার শর্ত মেনে চললে পরিবেশের প্রতিঝুঁকি অনেকাংশে কমে যেতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে শিপইর্য়াডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে টিএসডিএফ (ট্রিটমেন্ট স্টোরেজডিসপোজালফ্যাসিলিটি) স্থাপনের জন্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকারিভাবে টিএসডিএফ স্থাপন দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত।

গ্রিনইয়ার্ড গড়ায় উৎসাহিত করার লক্ষে যে সকল স্ক্র্যাপইয়ার্ড পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে জাহাজভাঙ্গা কার্যক্রম পরিচালনা করবে সে সকল স্ক্র্যাপইয়ার্ডকে TEX HOLIDAY/Green Benefit এর আওতায় এনে উৎসাহ প্রদান করা যেতে পারে। এতে অন্যরাও পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে উদ্যোগী হয়ে ওঠতে পারে। হংকং কনভেনশন কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট প্রদানে সাব-স্ট্যান্ডার্ড ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি বা অখ্যাত কোনো প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সার্টিফিকেট দেয়ার প্রবণতা যেন তৈরি না হয় সে ব্যাপারে মন্ত্রাণালয়ের দৃষ্টি আর্কষণ করছি। কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই উন্নতমানের তথা ইউরোপীয় বা জাপানকেন্দ্রিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি সমূহকে ব্যবহার করতে মন্ত্রাণলয়ের জোরালো ভূমিকা রাখা উচিত বলে আমরা মনে করি।

শ্রমিক সুরক্ষায় ইয়ার্ডে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যেমন: উইনঞ্চ মেশিনের ওয়্যার/ক্যাবল, ক্রেন, ক্রেন এর ওয়্যার, টাওয়ার ক্রেন, গ্যাস ডিটেকশন মিটারগুলোসহ প্রত্যেক সরঞ্জামের মান নিয়মিত স্বনামধন্য মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরীক্ষা করাতে হবে এবং বেস্ট প্রেকটিস্ড থার্ড পার্টি অডিট কর্তৃক নিয়মিত তদসংক্রান্ত সেইফওর্য়াকিং লোড ভেলিডেটি সনদ নিশ্চিত করতে হবে। এই সকল বিষয় তদারকিতে শিপইয়ার্ডগুলোতেসুযোগ্য সেইফটি অফিসার নিয়োগ করতে হবে। ম্যান এন্ট্রি ফর হটওয়ার্ক এর জন্যে ইয়ার্ডের সেইফটি অফিসাররাই দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকবে। জাহাজভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনাঅনুযায়ি কোনো স্পটে ঝুঁকি বা হটস্পট আছে কি না,তা চিহ্নিত করা সেইফটি অফিসারদেরই দায়িত্ব হওয়া উচিত। সেইফটি অফিসারদের NEBOSH সনদপ্রাপ্র বা সরকারিভাবে অনুমোদিত প্রশিক্ষণকেন্দ্র হতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলে শিপইর্য়াডে ঝুঁকি হ্রাসে তারা সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারবে। দেশীয় সকল নিয়মনীতি মেনে জাহাজকাটার কাজ করা হচ্ছে কি না তার জন্যে জাহাজের ট্যাংক বিভাজনের সকল পর্যায়ের ছবি এবং ভিডিও এর মাধ্যমে ডকুমেন্টেড করে রাখা উচিত যাতে পরিকল্পনাঅনুযায়ী জাহাজ পুন:প্রক্রিয়া হচ্ছে কি না-তা যাচাই বা পর্যবেক্ষণ করা যায়।

জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ তথা নিরাপদ উপায়ে জাহাজ বিচ্ছিন্নকরণ, বর্জ্যরে সঠিক চিহ্নিতকরণ, অবমুক্তকরণ ও নিষ্পত্তিকরার আন্তর্জাতিক ও উন্নত নানা মডেল রয়েছে- যা ইয়ার্ডমালিক, যথাযথ কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারেরাগাইডলাইন হিসেবে মেনে চলতে পারে। স্থায়ীত্ত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় রেখে নিরাপদ, শ্রমিক ও পরিবেশবান্ধব একটি শিল্পহিসেবে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে গড়ে তুলতে হলে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনদের নিয়ে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক- কর্মকর্তা, ইয়ংপাওয়ার ইন সোস্যাল অ্যাকশান (ইপসা)।